প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম
মৃত্যুরও একটি ন্যূনতম মর্যাদা আছে—এ বিশ্বাস মানবসভ্যতা হাজার বছর ধরে লালন করে এসেছে। যুদ্ধক্ষেত্রেও মৃতের প্রতি সম্মান, আহতের চিকিৎসা এবং শোকাহত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নীতিই আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের ভিত্তি। কিন্তু গাজায় সেই শেষ আশ্রয়টুকুও যেন ভেঙে পড়ছে।
একজন নিহত মানুষের জানাজায় অংশ নিতে জড়ো হওয়া মানুষদের ওপর ড্রোন হামলা—এ দৃশ্য শুধু একটি সামরিক ঘটনার বর্ণনা নয়; এটি মানবতার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। জীবিত অবস্থায় নিরাপত্তা নেই, মৃত্যুর পরও নেই শান্তি। শোক প্রকাশের অধিকারও যখন বিস্ফোরণের শব্দে স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন জাগে—একটি সমাজ আর কতটা অসহায় হলে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়?
ইসরাইল বলছে, হামলার লক্ষ্য ছিল একটি ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’। অন্যদিকে স্থানীয় সূত্র ও হাসপাতালগুলোর তথ্য বলছে, নিহতদের বড় অংশ ছিলেন সাধারণ মানুষ, যারা একটি জানাজার শোভাযাত্রায় অংশ নিতে এসেছিলেন। যুদ্ধের প্রতিটি পক্ষেরই নিজেদের বক্তব্য থাকে। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর এড়ানো যায় না—যদি কোনো সামরিক অভিযানে বারবার বেসামরিক মানুষ, নারী, শিশু ও শোকাহত মানুষ প্রাণ হারান, তবে সেই অভিযানের মানবিক ও আইনি বৈধতা কোথায় দাঁড়ায়?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও সহিংসতা থামছে না। যুদ্ধবিরতি কেবল একটি কাগুজে চুক্তি নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম আশ্বাস। অথচ গাজার বাস্তবতায় সেই আশ্বাস প্রতিদিন ভেঙে যাচ্ছে। একটি যুদ্ধবিরতি যদি শিশুদের জীবনও রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম মূল্য দেয় শিশুরা। যে শিশুরা কখনো রাজনীতি বোঝেনি, সীমান্ত চেনেনি, অস্ত্র ধরেনি—তারাই সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারাচ্ছে। একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের নয়, পুরো মানবজাতির ভবিষ্যতের ক্ষতি। প্রতিদিন যদি একটি শিশুর জীবন নিভে যায়, তবে বিশ্বসভ্যতার বিবেকও প্রতিদিন একটু একটু করে নিভে যায়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা কিংবা সীমিত উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিবৃতি, নিন্দা ও কূটনৈতিক ভাষার বাইরে গিয়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সব পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। যুদ্ধের মধ্যেও বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষা কোনো দয়া নয়, এটি আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা।
গাজার মানুষ আজ শুধু বোমার আঘাতে নয়, বিশ্ববিবেকের নীরবতার কাছেও পরাজিত হচ্ছে। তারা এমন এক বাস্তবতায় বাস করছে, যেখানে ঘর নিরাপদ নয়, হাসপাতাল নিরাপদ নয়, স্কুল নিরাপদ নয়, এমনকি জানাজার মিছিলও নিরাপদ নয়।
মানবতার ইতিহাসে এমন সময় এসেছে, যখন অস্ত্রের শক্তির চেয়ে বিবেকের শক্তিই বেশি প্রয়োজন। কারণ যুদ্ধ একদিন শেষ হবে, কিন্তু যে শিশুরা আর ফিরে আসবে না, যে মায়েরা সন্তান হারাবেন, যে পরিবারগুলো শোক বয়ে বেড়াবে—তাদের ক্ষত প্রজন্মের পর প্রজন্ম রয়ে যাবে।
আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি রাজনৈতিক নয়, সামরিকও নয়; এটি মানবিক—মৃতের জানাজায়ও যদি মানুষ নিরাপদ না থাকে, তবে আমরা ঠিক কোন সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করছি?