• ঢাকা সোমবার
    ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২
বললেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা

মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ১২:০৩ এএম

মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, জবাবদিহিমূলক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নেওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি কৃষি মৌসুমের বাস্তবতাও এ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ব্যয়ের সঠিক ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

রোববার (১২ এপ্রিল) রাজধানীর ফার্মগেটে ডেইলি স্টার ভবনের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: সামাজিক খাতে বিনিয়োগ জোরদার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। 

উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার এমন একটি অর্থনীতি পেয়েছে, যা বহু সমস্যায় জর্জরিত ছিল এবং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটের কারণে তা আরও তীব্র হয়েছে।

তিনি বলেন, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার জটিলতা দূর করতে সরকার ধীরে ধীরে সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এতে কোনো নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন না এবং অন্তর্ভুক্তি ও বর্জনের ভুল (ইনক্লুশন ও এক্সক্লুশন এরর) এবং ক্ষতি বাস্তবায়নের সমস্যা দূর হবে।

অধ্যাপক তিতুমীর জানান, সরকার ধাপে ধাপে বাস্তবভিত্তিক নীতি অনুসরণ করে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে একটি সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করতে ‘এক কার্ড, এক নাগরিক, এক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় জিডিপিসহ বিভিন্ন পরিসংখ্যান যাচাইয়ের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, রাজস্ব নীতিকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে সম্পদের দক্ষ বণ্টন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যেই একটি পরিবারে একটি কার্ডের মাধ্যমে সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো সরকার কৃষকদের জন্য ব্যাংকের মাধ্যমে কার্ড চালু করতে যাচ্ছে।

তিনি জানান, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ভর্তুকিভিত্তিক বিভিন্ন সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি নীতিগতভাবে ভুল কমিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে আর্থিক সক্ষমতার পরিধি (ফিসকাল স্পেস) বাড়ানো যায়।

সরকার ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাজেট বাস্তবায়নের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন বর্তমানে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বলেও তিনি জানান।

অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে কিছু ধরনের বাধ্যবাধকতা আসছে, যা সবসময় শিশু বা নারীবান্ধব নাও হতে পারে। তবে তিনি বলেন, জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা করছে না।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও নীতিগত সামঞ্জস্য (হারমোনাইজেশন) থাকা প্রয়োজন।

বৈঠকে অন্য বক্তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাসহ সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তারা বলেন, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সামাজিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিক্ষা, শিশুকল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশন-এর নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দকে মানবসম্পদ গঠনের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম শিশু অধিকার উন্নয়নে গণমাধ্যমকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার ওপর জোর দেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হলে বাজেট অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ জরুরি।

ইউএন উইমেন-এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলি সিং বলেন, সামাজিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সেই ব্যয়ের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী ট্র্যাকিং ব্যবস্থা প্রয়োজন।

বৈঠকে ইউনিসেফের সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড ইকোনমিক স্পেশালিস্ট মো. আশিক ইকবাল জানান, উন্নয়ন বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বড় অংশই ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে উন্নয়ন বাজেটের ব্যবহার হয়েছে ৪৭.৪ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে মাত্র ৯.৮ শতাংশ। আগের দুই অর্থবছরেও এ হার প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল।

তিনি সামাজিক সুরক্ষা কাভারেজ কমে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে অগ্রাধিকারের উল্লেখকে স্বাগত জানান।

অর্থ ও বাণিজ্য সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ