প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২৬, ১২:০৮ এএম
সড়কে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। সকাল থেকে বিকাল—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক দুর্ঘটনায় বৃহস্পতিবারই প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন। কক্সবাজারের চকরিয়া ও নেত্রকোনার পূর্বধলায় দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনাতেই নিহত হয়েছেন আটজন। বাকি ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে নওগাঁ, বগুড়া, ফেনী, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, ফরিদপুর ও গাজীপুরে।
একটি দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই থেমে যাচ্ছে একটি পরিবারের স্বপ্ন। কোথাও বাবা হারাচ্ছেন সন্তানকে, কোথাও সন্তান হারাচ্ছে বাবাকে, আবার কোথাও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি আর ফিরছেন না ঘরে। দুর্ঘটনার পর পড়ে থাকছে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যানবাহন, আর হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারি।

চকরিয়ার খুটাখালীতে যাত্রীবাহী জিপ ও বাসের সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় জিপটি দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ছাদ ছিটকে পড়ে। আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন, যাদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
নেত্রকোনার পূর্বধলায় পিকআপ ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নারীসহ চারজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া নওগাঁয় সেনা সদস্যসহ দুজন, বগুড়ায় বিএনপি নেতা, ফেনীতে পথচারী, টাঙ্গাইলে শিশু, গোপালগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে দুই মোটরসাইকেলচালক, কুমিল্লায় যুবক, ফরিদপুরে স্কুলছাত্রী এবং গাজীপুরে এক নারী নিহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির এই চিত্র শুধু একটি দিনের নয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ২০৭ জন নিহত হয়েছেন। জানুয়ারিতে ৫৪৬, ফেব্রুয়ারিতে ৪৪৭, মার্চে ৬১৯, এপ্রিলে ৫১০, মে মাসে ৬২২ এবং জুনে ৪৬৩ জন নিহত হন। এই হিসাবে ছয় মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির চিত্রও উদ্বেগজনক। একই সময়ে ৩২০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬০ জন শিক্ষার্থী নিহত এবং ১০৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
জুলাইয়ের হিসাবেও বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে পার্থক্য দেখা গেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে জুলাইয়ে ৪২৭টি দুর্ঘটনায় ৩৮০ জন নিহত ও ৫৪২ জন আহত হয়েছেন—তবে এটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পরিসংখ্যান, তাই ২০২৬ সালের সঙ্গে মেলানো ঠিক হবে না। ২০২৬ সালের জুলাই নিয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত তথ্যে ৪৫৮টি দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
পরিসংখ্যানে সংস্থাভেদে পার্থক্য থাকলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে—সড়কে প্রাণহানি ভয়াবহভাবে অব্যাহত রয়েছে। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, চালকের অসতর্কতা, যানবাহনের ত্রুটি, সড়কের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক আইন না মানার মতো বিষয়গুলো বারবার দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সামনে আসে।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও দুর্ঘটনা থামছে না। তাই প্রশ্ন উঠছেই—আর কত প্রাণ গেলে টনক নড়বে? কবে থামবে এই মৃত্যুর মিছিল? কবে নিরাপদ হবে দেশের সড়ক?
সড়ক নিরাপদ করতে শুধু দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলে হবে না; চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কঠোরতা, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নইলে প্রতিদিনের সংবাদে দুর্ঘটনার খবরের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকবে আরও কিছু পরিবারের কান্না।