প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৫, ২০২৬, ১২:২২ পিএম
গত এক দশকে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন—২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—ছিল মূলত জনগণের ভোটাধিকার হরণ করার এক সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীলনকশা। ২০১৪ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের বহুল আলোচিত ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের তথাকথিত ‘ডামি নির্বাচন’—এই তিন ধাপে জনগণের রায়কে ধারাবাহিকভাবে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে।
‘জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে এসব নির্বাচন সাজানো হয়েছিল। আসন সীমানা নির্ধারণ থেকে শুরু করে দল নিবন্ধন—নির্বাচনের প্রতিটি ধাপেই ছিল কারচুপির ছক।
সরকার গঠিত পাঁচ সদস্যের এই তদন্ত কমিশন সম্প্রতি তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়। এতে বলা হয়, তিনটি নির্বাচনেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি নির্বাচন কারচুপির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যুক্ত ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে এনএসআইয়ের জেলা শাখাগুলোকে কাজে লাগানো হয়। একই সঙ্গে এনএসআইয়ের তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার গায়েবি মামলার তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এসব মামলার মাধ্যমে নির্বাচনের আগেই বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেফতা , হয়রানি ও এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়, যাতে মাঠ পুরোপুরি ফাঁকা থাকে।
তদন্তে আরও বলা হয়, প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয়, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তা ছিল। অনেক কেন্দ্রে পুলিশ ভোটারদের প্রবেশে বাধা দেয় এবং কৃত্রিম লাইন তৈরি করে ভোটগ্রহণ স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে।
২০১৪: প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন
প্রতিবেদনে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘একতরফা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ওই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে সংসদ সদস্যরা বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। হুমকি, চাপ এবং মনোনয়নপত্রে তথাকথিত ত্রুটির অজুহাতে অধিকাংশ আসনে একক প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। সরকার গঠনের জন্য ১৫১টি আসনকে বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছিল।
২০১৮: ‘রাতের ভোট’
২০১৪ সালের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হওয়ায় ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর কৌশল নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের আগের রাতেই ব্যালট সিল মারা হয়। ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে বলে দেখানো হয় এবং ৭ হাজার ৯০২টি কেন্দ্রে ভোট কাস্টিং দেখানো হয় ৯০ শতাংশের বেশি।
এই নির্বাচনের জন্য এনএসআই হেডকোয়ার্টার্সে ‘স্পেশাল সেল’ নামে একটি ইলেকশন সেল খোলা হয়, যার মাধ্যমে পুরো নির্বাচন মনিটরিং করা হয়। নির্বাচন শেষে ওই সেলের কন্ট্রোলরুমের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
২০২৪: ‘ডামি নির্বাচন’
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে তদন্ত কমিশন ‘ডামি নির্বাচন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করায় নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখাতে ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের দিয়ে তথাকথিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করা হয়। ভোটার উপস্থিতি ছিল নগণ্য, তবে বিভিন্ন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা প্রিসাইডিং অফিসারদের সহায়তায় ব্যালটে সিল মারেন।
সীমানা নির্ধারণ ও দল নিবন্ধনে কারসাজি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দিতে সংসদীয় আসনের সীমানা পরিকল্পিতভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৩৩টি আসনের সীমানা পরিবর্তন করে বিরোধী সমর্থিত এলাকাগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। একইভাবে দল নিবন্ধনেও অস্বচ্ছ ও উদ্দেশ্যমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেখানে আইন বা বিধিমালার বাইরে গিয়ে একাধিক দলকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন আইন পরিবর্তনের অভিযোগ
তদন্তে উঠে আসে, একদলীয় শাসনব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, ইভিএম চালু এবং নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করা হয়। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বিরোধী দল ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করে।
অনিয়মের প্রতীক: গাইবান্ধা উপনির্বাচন
প্রতিবেদনে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনকে অনিয়মের প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সিসিটিভির মাধ্যমে ভোট পর্যবেক্ষণ ছিল লোক দেখানো উদ্যোগ। ব্যাপক অনিয়মের কারণে শেষ পর্যন্ত ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে বাধ্য হয় নির্বাচন কমিশন।
প্রতিবেদনের উপসংহারে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সব ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।