প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১১:০৮ পিএম
বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে বলে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় ইউরিয়া সারের সরবরাহ ও দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ দুটি প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ইতোমধ্যে লাখ লাখ মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তা, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ঘাটতির মধ্যে রয়েছে।
ডব্লিউএফপি সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও সার পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সময়ে এফএও, ইফাদ, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২০২৫ সময়ে বাংলাদেশের চার কোটি ৫৪ লাখ মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে ছিল। অর্থাৎ, প্রতি চারজনের একজনেরও বেশি মানুষ নিয়মিত পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে পারেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা কয়েকটি জাহাজে হামলার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশের আমদানি করা জ্বালানি ও ইউরিয়া সারের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে।
বৃহস্পতিবার ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের প্রায় ৮০ শতাংশ সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এসব দেশ থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ ইউরিয়া মজুত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী অক্টোবর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। কিন্তু এর পর সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটের কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে তিনটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
ডব্লিউএফপির আশঙ্কা, সার সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এতে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়বে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলমান এই সংকটের কারণে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ শীর্ষক জাতিসংঘের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৫ সময়ে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৬ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় চার কোটি ৫৪ লাখ মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে ছিল। যদিও ২০১৪-১৬ সময়ে এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হয়েছে। তবে এখনও লাখ লাখ মানুষ নিয়মিত ও পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে পারছে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে দেশের এক কোটি ৪৩ লাখ মানুষ অপুষ্টিজনিত ক্ষুধায় ভুগেছে। ২০০৪-০৬ সময়ে এ সংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি ১৯ লাখ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ছয় কোটি ৭৮ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০ কোটি ১৮ লাখ। অর্থাৎ, কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও প্রায় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দুজন প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য কিনতে পারে না। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। পাকিস্তানে ৬৩ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই।
যে সুষম খাবারে একজন মানুষের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় দুই হাজার ৩৩০ কিলোক্যালরি শক্তি নিশ্চিত হয়, প্রতিবেদনে তাকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা (হেলদি ডায়েট বাস্কেট) বোঝানো হয়েছে। এতে শর্করা, প্রাণিজ আমিষ, ডাল ও শুঁটি, বাদাম ও বীজ, শাকসবজি, ফলমূল এবং তেল-চর্বি– এই ছয়টি খাদ্যশ্রেণি অন্তর্ভুক্ত থাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একজন মানুষের প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর খাদ্যের গড় ব্যয় ২০১৭ সালের ৩ দশমিক ৯ ডলার (পিপিপি) থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৫৯ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ব্যয় বাড়লেও দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান ও শ্রীলঙ্কার পর বাংলাদেশেই এ খরচ সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেদন বলছে, এই ব্যয়ের বড় অংশই মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফল ও শাকসবজি কেনায় ব্যয় হয়। ফলে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা এখনও নাগালের বাইরে।
শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হারও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বা প্রায় ১৭ লাখ ওয়েস্টিং বা তীব্র ক্ষীণতায় ভুগেছে। একই সময়ে ২৫ দশমিক ১ শতাংশ বা প্রায় ৪২ লাখ শিশু খর্বাকৃতির ছিল। অন্যদিকে, ৫ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু ছিল অতিরিক্ত ওজনের। অর্থাৎ, দেশে একই সঙ্গে অপুষ্টি ও অতিপুষ্টির সমস্যা বিদ্যমান। ছয় থেকে ২৩ মাস বয়সী মাত্র ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু ন্যূনতম খাদ্য বৈচিত্র্য অর্জন করেছে। অর্থাৎ, অধিকাংশ শিশুই প্রয়োজনীয় সব খাদ্যশ্রেণির খাবার পাচ্ছে না। এ ছাড়া একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান করানোর হার ২০১২ সালের ৬৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। নারীদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগেছেন, যা ২০১২ সালের তুলনায় বেশি।