প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় খাল পুনঃখননের অজুহাতে বন বিভাগের সামাজিক বনায়নের দুই শতাধিক গাছ কেটে ফেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশ বিধ্বংসী এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন ইতিমধ্যেই চার সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটিকে আগামী শনিবারের (২৩ মে) মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
খালের দুই কিলোমিটার অংশে তাণ্ডব :
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, উপজেলার গুনবহা ইউনিয়নের নদীয়ার চাঁদ এলাকার মধুমতী নদী থেকে কামারগ্রাম স্লুইসগেট পর্যন্ত খালের প্রায় দুই কিলোমিটার অংশে বর্তমানে খনন কাজ চলছে। অভিযোগ উঠেছে, এই খনন কাজের আড়ালে গত সপ্তাহে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় রোপণ করা প্রায় ১৫ বছর বয়সী দুই শতাধিক মূল্যবান মেহগনি ও শিশু গাছ কেটে ফেলা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, খাল খননের অজুহাতে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালী মহল ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই বিপুল সংখ্যক গাছ কেটে আত্মসাৎ (গায়েব) করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘খাল কাটার নামে বৃক্ষ নিধন’ শিরোনামে ভিডিও ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে।
অভিযান ও গাছ জব্দ:
ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে গত রবিবার (১৭ মে) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নদেরচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক তথা স্থানীয় সামাজিক বনায়ন কমিটির সভাপতি হেমায়েত উদ্দিনের বাড়িতে ঝটিকা অভিযান চালান। অভিযানকালে তার বাড়ি থেকে অবৈধভাবে কেটে ফেলা গাছের অন্তত ৬০টি কাণ্ড ও গুঁড়ি জব্দ করা হয়। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত হেমায়েত উদ্দিন পলাতক রয়েছেন।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা :
স্থানীয়ভাবে এই গাছ কাটার নেপথ্যে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও গুনবহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামের সমর্থকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সিরাজুল ইসলাম।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, "আমি খাল খনন প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও গাছ কাটার সঙ্গে আমার বা আমার সমর্থকদের কোনো দূরতম সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাকে হেয় করতে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।"
প্রশাসনের কঠোর অবস্থান:
এ বিষয়ে বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি অনুসরণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
বন বিভাগের বক্তব্য:
উপজেলা বন কর্মকর্তা দীন মোহাম্মদ মোল্লা বলেন, "পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় খালপাড়ের গাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খনন কাজের জন্য গাছ অপসারণের প্রয়োজন হলেও তার সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। বন বিভাগ থেকে কাউকে গাছ কাটার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হুঁশিয়ারি:
বোয়ালমারী ইউএনও এস এম রাকিবুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "অবৈধভাবে গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। সরকারি সম্পত্তির গাছ ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করার কোনো সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী এগুলো নিলামে বিক্রি করে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।"
বিভাগীয় বন কর্মকর্তার আশ্বাস:
ফরিদপুর বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, "বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললেই জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
বর্তমানে এলাকায় এই বৃক্ষ নিধনের ঘটনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল আশা করছেন, তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীরা দ্রুতই চিহ্নিত হবে।