প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ইরানে যৌথভাবে `অপারেশন এপিক ফিউরি` লঞ্চ করে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল। এই হামলার মধ্য দিয়ে `অফিসিয়ালি` শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র- ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ।
এই যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিলেন, ক্ষমতায় আসলেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই অ্যাপ্লাই করলেন নিউটনের ৩য় সূত্র। তবে, একটু উল্টো দিয়েছেন নিউটনের ল`। যেমন: শুল্ক আরোপ করেছেন, কোভিড পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনীতি বিবেচনা না করে। যে দেশই আপত্তি জানিয়েছে, সেসব রাষ্ট্রে আরোপ করেছেন একের পর এক নিষেধাজ্ঞা। শুধু তাই নয়, নিষেধাজ্ঞা না মানলে আবার নিষেধাজ্ঞা। এরপর গ্রিনল্যান্ড কেনার ভীমরতি ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। না মানায়, ডেনমার্ককে দিয়েছেন সামরিক হামলার হুমকিও। এরপর নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেয়ে, হতাশায় বলেছেন, কতগুলো যুদ্ধ থামিয়েছি, তারপরও পুরস্কার পাইনি। শান্তি বজায় রাখার একতরফা দায়িত্ব শুধু তিনি নেননি। এরপর হুমকিও দিয়েছেন, এখন থেকে আর `মিস্টার নাইস গায়` থাকবেন না।
যেমন কথা, তেমন কাজ। হঠাৎ করেই একজন প্রেসিডেন্টকে ঘুমন্ত অবস্থায় তার স্ত্রীসহ তুলে নিয়ে আসলেন যুক্তরাষ্ট্রে। এমনকি, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে নাইকের `ট্র্যাক সুট`টিও পরিবর্তন করার সময় দেননি। এরপর টার্গেট করলেন ইরান। এসব পরিস্থিতি দূর থেকে একটি দেশ পর্যবেক্ষণ করছেন নিবিড়ভাবে। চীন।
চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রণকৌশল পর্যবেক্ষণ কোন সখের বসে করা নয়। একদিকে, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের `কোল্ড ট্রেড-ওয়ার`। অপরদিকে, তাইওয়ান, যে দেশটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে বারবার বিবৃতি দিয়েছে চীন। একইসঙ্গে সতর্কও করেছে, যে রাষ্ট্রই চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে, পরিণতি হবে `ভয়াবহ`।
এমনকি, সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছিলেন, চলমান তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে অস্তিত্ব সংকটে আছে জাপান। এমন মন্তব্যের পর ক্ষিপ্ত হয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে হুশিয়ারি দিয়েছিলো, জাপান যাতে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলায়।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এসেছে যুদ্ধ ব্যবহৃত `নিউ জেনারেশন প্রযুক্তি` থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান `এফ-৩৫` ও বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান।
ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে নিখুঁত লক্ষ্যভেদী গাইডেড বোমা, দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে তারা ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও নৌ-ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান বেছে নিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল। কম খরচের ড্রোন, স্বল্প প্রযুক্তির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘একইসঙ্গে অনেকগুলো মিসাইল’ হামলার পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা যুক্তরাষ্ট্রের লেটেস্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো সিস্টেমকেও ফাঁকি দিচ্ছে ইরান।
মূলত, এখানেই বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের সংজ্ঞা। একটি ২০ হাজার ডলারের ড্রোন যদি কয়েক মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত বা অকার্যকর করে দিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেবল প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের ওপর নির্ভর করবে না বরং নির্ভর করবে সামরিক কৌশল, গতি ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর।
চীনের সামরিক বিশ্লেষকরা এই যুদ্ধকে দেখছেন ‘ভবিষ্যতে সম্ভাব্য তাইওয়ান যুদ্ধের প্রাক-অনুশীলন’ হিসেবে।
চীনা বিমান বাহিনীর কর্নেল ফু ছিয়ানশাওর মতে, এই সংঘাত থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রযুক্তিগতভাবে অ্যাডভান্সড সামরিক শক্তিকেও ইরানের তুলনামূলক সস্তা ড্রোন কৌশল ভোগান্তিতে ফেলেছে।
এখানেই চীনের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। দেশটি ইতোমধ্যে হাইপারসনিক মিসাইল, দীর্ঘপাল্লার রকেট ব্যবস্থা ও স্টেলথ প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটির জে-২০ স্টেলথ যুদ্ধবিমানকে এখন অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের `এফ-৩৫`-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন।
পাশাপাশি, তারা নতুন স্টেলথ বোমারু বিমানও তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে `মার্কিন বি-২` বা `বি-২১`-এর সমকক্ষ হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের বড় দুর্বলতা হচ্ছে বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) সর্বশেষ বড় যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে সংঘর্ষে।
বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক, আফগানিস্তানসহ বহু যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তবে, ইতিহাস বলে ইরাক-আফগানিস্তান-ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে মার্কিন অভিযান কখনোই সফল হয়নি।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা এমন একটি বিষয়, যা শুধু প্রযুক্তি দিয়ে পূরণ করা যায় না। একথা ঠিক যে মার্কিন বাহিনীর বেশ কয়েকটি দেশে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে। একইসঙ্গে তিক্ত অভিজ্ঞতাও কম নয়।
বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চলগুলোর একটি এখন তাইওয়ান প্রণালি। তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে আসছে চীন।
একইসঙ্গে, বারবার দেশটি সতর্ক করেছে তাইওয়ান ইস্যুতে বিদেশি হস্তক্ষেপ হলে তার পরিণতি হবে `ভয়াবহ`। এই অবস্থায় ইরান যুদ্ধ থেকে চীন বুঝতে চাইছে যদি ভবিষ্যতে তাইওয়ানে সংঘাত শুরু হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। চীন হয়তো ‘ড্রোন’ কৌশল ব্যবহার করবে, যেখানে শত শত ড্রোন একসঙ্গে আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার চেষ্টা করবে।
তবে তাইওয়ানও বসে নেই। ড্রোন শনাক্তকরণ ও ধ্বংস করতে একের পর এক উন্নত প্রযুক্তির সামরিক চালানের অনুমোদন দিচ্ছে দেশটির পার্লামেন্ট। আর তাইওয়ানকে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে চীনের চির প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র।
যদিও বিশ্লেষকদের মতে, তাদের বর্তমান সক্ষমতা এখন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। গত মাসে দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যেখানে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এই যুদ্ধের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো আঞ্চলিক সংঘাত এখন আর `আঞ্চলিক` থাকছে না। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র।
একইভাবে তাইওয়ান বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। ফলে এই দুই অঞ্চলে যেকোনো বড় সংঘাত সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছে বিশ্লেষকরা।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দীর্ঘস্থায়ী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। আর যদি ভবিষ্যতে, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সংঘাত শুরু হয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
ইরান যুদ্ধ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও সবার সামনে এনেছে। আর সেটি হচ্ছে সামরিক শক্তি সবসময় রাজনৈতিক সমাধান এনে দেয় না। যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত সাফল্য পাওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বেশ কঠিন।
আফগানিস্তান ও ইরাকের সামরিক অভিযানের মতোই ইরান যুদ্ধও দেখাচ্ছে, প্রযুক্তিগত আধিপত্য থাকলে-ই চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত হয় না।
এ বিষয়ে বিশ্লেষক ক্রেইগ সিঙ্গেলটন বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে জয় মানেই রাজনৈতিকভাবে `বিজয়` নয়।
বর্তমান সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয় বরং এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা তৈরির লড়াই। একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে। অন্যদিকে, মার্কিন বাহিনীর প্রতিটি অ্যাটাক, প্রতিটি রণকৌশল, প্রতিটি দুর্বলতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে চীন।