• ঢাকা মঙ্গলবার
    ১৯ মে, ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

জুয়া: নীরব এক সামাজিক মহামারী

প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ১০:১১ পিএম

জুয়া: নীরব এক সামাজিক মহামারী

সম্পাদকীয়

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ, মাদক কিংবা দুর্নীতির মতোই আরেকটি ভয়ংকর নীরব মহামারীর নাম—জুয়া। এটি শুধু অর্থ হারানোর খেলা নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, পরিবার, বিবেক ও ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে গিলে খাওয়া এক অদৃশ্য দানব। বাইরে থেকে ঝলমলে, রঙিন আর দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখালেও, বাস্তবে জুয়া অসংখ্য মানুষের জীবনকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে একসময় জুয়া সীমাবদ্ধ ছিল কিছু গোপন আসর কিংবা উৎসবকেন্দ্রিক খেলায়। কিন্তু প্রযুক্তির বিস্তারে আজ মোবাইল ফোনের পর্দায় পৌঁছে গেছে অনলাইন বেটিং, ক্যাসিনো অ্যাপ, ক্রিকেট বেটিং ও নানা ধরনের জুয়ার ফাঁদ। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী—অনেকেই দ্রুত লাভের আশায় এই অন্ধকার জগতে জড়িয়ে পড়ছে। প্রথমে কৌতূহল, পরে অভ্যাস, আর শেষে নেশা—এই তিন ধাপেই মানুষ হারিয়ে ফেলছে নিজের নিয়ন্ত্রণ।

জুয়া কখনো কাউকে সত্যিকারের বিজয়ী বানায় না। কিছু মানুষ সাময়িক লাভ পেলেও, শেষ পর্যন্ত এই খেলা কেড়ে নেয় শান্তি, বিশ্বাস ও মানবিকতা। জুয়ার টেবিলে জেতা টাকার চেয়ে হারানো জীবনের সংখ্যা অনেক বেশি।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন বিদেশি বেটিং সাইটে চলে যাচ্ছে। পরিবারে বাড়ছে অশান্তি, ঋণের বোঝা, আত্মহত্যা ও অপরাধ। অনেক তরুণ নিজের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করছে, কেউ কেউ পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করেও জুয়ার ঋণ শোধ করতে পারছে না। একসময় যে মানুষটি স্বপ্ন দেখত নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার, সে আজ রাত জেগে মোবাইল স্ক্রিনে ভাগ্যের চাকা ঘোরায়।

বিশ্ব পরিস্থিতিও কম ভয়াবহ নয়। যুক্তরাজ্য, ভারত, অস্ট্রেলিয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্র—সবখানেই জুয়া আজ বড় সামাজিক সংকট। অস্ট্রেলিয়ায় গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের অন্যতম উচ্চ জুয়া-ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় রয়েছে তারা। যুক্তরাজ্যে বহু তরুণ অনলাইন বেটিং আসক্তির কারণে মানসিক বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকিতে পড়ছে। ভারতে আইপিএল কেন্দ্রিক বেটিং সিন্ডিকেট বহু পরিবার ধ্বংস করেছে। আফ্রিকার কিছু দেশে বেকার তরুণদের “দ্রুত ধনী হওয়ার” স্বপ্ন দেখিয়ে জুয়ার অ্যাপগুলো কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—জুয়া মানুষকে ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একজন আসক্ত ব্যক্তি প্রথমে ভাবে, “আরেকবার খেললে আগের ক্ষতি উঠে আসবে।” কিন্তু সেই “আরেকবার” আর শেষ হয় না। ক্ষতির পর ক্ষতি, মিথ্যার পর মিথ্যা, ঋণের পর ঋণ—একসময় মানুষ নিজের আত্মসম্মানও হারিয়ে ফেলে। পরিবার ভেঙে যায়, সম্পর্ক নষ্ট হয়, সন্তানরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে যায়।

জুয়া শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ। যখন একটি তরুণ প্রজন্ম পরিশ্রমের বদলে ভাগ্যের উপর নির্ভর করতে শেখে, তখন সমাজের উৎপাদনশীল শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষ সৎ পরিশ্রমে বিশ্বাস হারায়। অপরাধ, চুরি, প্রতারণা ও সহিংসতার পথও অনেক সময় এই জুয়ার নেশা থেকেই শুরু হয়।

তাই এখনই সময় কঠোর সামাজিক সচেতনতা তৈরির। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারকে অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হতে হবে, একই সঙ্গে তরুণদের বিকল্প বিনোদন, কর্মসংস্থান ও মানসিক সহায়তার পথ তৈরি করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, জুয়া কখনো কাউকে সত্যিকারের বিজয়ী বানায় না। কিছু মানুষ সাময়িক লাভ পেলেও, শেষ পর্যন্ত এই খেলা কেড়ে নেয় শান্তি, বিশ্বাস ও মানবিকতা। জুয়ার টেবিলে জেতা টাকার চেয়ে হারানো জীবনের সংখ্যা অনেক বেশি।

আজ আমাদের প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ পরিশ্রম নয়, ভাগ্যের জুয়ায় ভবিষ্যৎ খোঁজে? যদি না চাই, তবে এখনই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ জুয়া শুধু অর্থ নয়, একটি জাতির বিবেককেও ধ্বংস করে।

আর্কাইভ