প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ১০:৫২ পিএম
জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় বাজেট। তবে বাজেটের আকার যত বড়ই হোক না কেন, এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের জীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব কতটা দৃশ্যমান হয় তার ওপর।
সরকার এবারের বাজেটের শিরোনাম দিয়েছে— ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। এই শিরোনাম কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের একটি অঙ্গীকারও বটে। কিন্তু এই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু পরিকল্পনা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই হবে মূল চাবিকাঠি।
নতুন বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ইতিবাচক দিক। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পে এই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা গেলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, উন্নয়ন প্রকল্পে সময়ক্ষেপণ, ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল তদারকির কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল অনেক সময় অর্জিত হয় না। তাই এবার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধ ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হওয়া দেশের আর্থিক চাপের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। শুধু সুদ পরিশোধেই ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার অর্থ হলো, উন্নয়ন ব্যয়ের একটি বড় অংশের সমপরিমাণ অর্থ অতীতের ঋণের দায় মেটাতেই চলে যাচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা।
রাজস্ব আহরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাও বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে। কর ব্যবস্থায় সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ, করজাল সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী না হলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি—এসব ক্ষেত্রেও সরকারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বাজেট যেন কেবল সংখ্যার হিসাব না হয়ে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।
বাজেট কোনো সরকারের সফলতার একমাত্র মাপকাঠি নয়; বরং সেই বাজেট কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হলো এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারল—সেটিই ইতিহাসে মূল্যায়িত হবে। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বিশাল বাজেট সরকারের জন্য যেমন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, তেমনি জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের এক কঠিন পরীক্ষাও সামনে এনে দিয়েছে।