প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও, ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনি কার্যক্রমের পুরাতন রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একইসঙ্গে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন হলেও রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের অনেকের মধ্যে “বিজয়ী হতেই হবে” এই চর্চাও অব্যাহত রয়ে গেছে বলে মনে করে সংস্থাটি।
আজ টিআইবির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে ‘‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনপ্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ” শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উল্লিখিত মন্তব্য করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান; গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান ও অ্যাসিস্ট্যান্ট কোঅর্ডিনেটর, ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন রিফাত রহমান। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মোঃ মাহ্ফুজুল হক।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। ৯৯ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনো নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন। দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নমুনাভিত্তিকভাবে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জালভোট প্রদানের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে এবং ৪০ শতাংশ আসনে একাধিক অনিয়মের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। প্রচারণা ব্যয়ের সীমা (অনলাইন ও অফলাইন) একক ও যৌথভাবে ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে, শীর্ষ দুই দল বিএনপি (৩২৭.৫ শতাংশ), ও জামায়াত (৩১৫.২ শতাংশ) প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই লঙ্ঘনের মাত্রা সর্বাধিক। জাতীয় পার্টি (১২৮.৬ শতাংশ), এনসিপি (১৯.০ শতাংশ)। ব্যয়সীমা অতিক্রান্ত প্রার্থী গড়ে ১ কোটি ৬৪ লক্ষ ৯৮ হাজার ১০১ টাকা ব্যয় করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য অনুযায়ী ২৩৬ জন সংসদ সদস্য কোটিপতি (৭৯.৪৬ শতাংশ), যাদের মধ্যে ১৩ জন শতকোটিপতি। এ ছাড়া, ত্রয়োদশ সংসদের অর্ধেক সংসদ সদস্যেরই দায় বা ঋণ রয়েছে, যার পরিমান ১১,৩৫৬ কোটি টাকা। যা বিগত চার সংসদের তুলনায় সর্বোচ্চ। দলগত ভাবে বিএনপিতে এই হার ৬২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীতে ১৬ শতাংশ। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের ভিত্তিতে শীর্ষ ১০ শত কোটিপতি সংসদ সদস্যের ০৯ জনই বিএনপির এবং একজন সতন্ত্র। শীর্ষ ১০ ঋণ বা দায়যুক্ত সংসদ সদস্যের তালিকায় প্রত্যেকেই বিএনপির। জমির মালিকানার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কমপক্ষে ১ একর জমি আছে প্রায় ৬২ শতাংশ সংসদ সদস্যের, সংখ্যায় ১৮৪ জন, যা বিগত ৪টি সংসদের তুলনায় সর্বোচ্চ।
নির্বাচিত সদস্যদের পেশাভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, দ্বাদশ সংসদের তুলনায় এয়োদশ সংসদে ব্যবসায়ীদের (প্রায় ৬০ শতাংশ) সংখ্যা ৫ শতাংশ কমেছে, যদিও নবম সংসদের তুলনায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। বিগত চারটি সংসদের তুলনায় এবারই সবচেয়ে বেশি শিক্ষক (৮.১ শতাংশ) সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন, রাজনীতিবিদদের সংখ্যা সর্বনি¤েœ। এ ছাড়া, আইন পেশায় রয়েছেন ১১.৮ শতাংশ। ত্রয়োদশ সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২.৩৬ শতাংশ, যা ২০০৮ সালের নবম সংসদের অর্ধেক এবং বিগত ৪টি নির্বাচনের তুলনায় সবচে কম। অর্থাৎ এবার মাত্র ৭ জন নারী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে নবম সংসদে ১৪ জন, দশম সংসদে ২০ জন, একাদশ সংসদে ২২ জন এবং দ্বাদশ সংসদে ২০ জন নারী সদস্য ছিলেন।
এবারের সংসদ অপেক্ষাকৃত তরুণ, প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন ২০৯ জন বা ৭০ শতাংশ, সম্ভাব্য সংসদ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতার দুইজনই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন। এ ছাড়া, ত্রয়োদশ সংসদের ৮৪.৮৩ শতাংশই ¯œাতক, ¯œাতকোত্তর ও উচ্চ ডিগ্রিধারী। দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং বিদেশে আয় ও সম্পদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ০৮ জন সংসদ সদস্য বৈদেশিক উৎস থেকে আয় করেন। ০৫ জন সংসদ সদস্য বিদেশে অস্থাবর সম্পদ, বৈদেশিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা বিনিয়েগের তথ্য দিয়েছেন। ০৩ জন সংসদ সদস্য বাংলাদেশের বাইরে স্থাবর সম্পদ বা জমি-জমার মালিকানা রয়েছে বলে তাঁদের হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে আচরণবিধি প্রতিপালনে পরিপূর্ণ সফল হয়নি। কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন হলেও রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের অনেকের মধ্যে “বিজয়ী হতেই হবে” এই চর্চা অব্যাহত ছিলো। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর দিকে সুস্থ প্রতিযোগিতার উপাদানগুলো আমরা দেখেছি, কিন্তু নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসতে আসতে তা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত হয়েছে। এ ছাড়া, পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী অবস্থান ও তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, ধারাবাহিকতায় যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে বিশেষত বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন পরস্পরবিরোধী দুটি জোটের প্রার্থীদের একাংশ এবং দলের মনোনয়ন না পেয়ে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন- তাদের অনেকের মধ্যে এই ত্রিমুখী অসহিষ্ণুতা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহিংসতা হয়েছে।’
নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও পেশী, পুরুষতান্ত্রিক ও গরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই কয়েকটি বিষয়ের কারণে সুস্থ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ব্যাহত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এ সকল উপাদান মনোনয়নসহ প্রচার-প্রচারণাকে প্রভাবিত করেছে। এর ফলে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বলতে যা বুঝায়, সেটি কতটুকু হয়েছে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচনা করা দরকার। পাশাপাশি সহিংসতা ও এ অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধীসহ প্রান্তিক মানুষের মনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের ওপর অনলাইন ও অফলাইন হামলার ফলে তারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়া বা নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করেছে। যার প্রতিফলন দেখা গেছে ভোটের ‘‘টার্ন আউট’’ বা উপস্থিতির হারে। প্রায় ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে, পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় ভালো মনে হলেও বাংলাদেশের মানদণ্ডে আশাপ্রদ নয়। তা ছাড়া, ভোটারদের একাংশের মনে এই আস্থা হয়তো তৈরি হয়নি যে, ভোট দিলে তাদের জন্য ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আসবে। এই আস্থাহীনতা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটারের ভোটদান থেকে বিরত থাকার কারণ হতে পারে। অন্যদিকে নতুন সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব সাম্প্রতিককালের মধ্যে সর্বনিম্ন। যা রাজনীতিতে ধর্মান্ধতা, পুরুষতান্ত্রিকতা ও অর্থশক্তির নেতিবাচক প্রভাবের ফলাফল।’
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সক্রিয়তা ও সদিচ্ছা থাকলেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করা অনিয়মগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি মন্তব্য করে ড. জামান বলেন, ‘সকল প্রার্থী ও ভোটারদের জন্য পূর্ণাঙ্গ সমঅধিকার-ভিত্তিক সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও নিরাপদ নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ঘাটতি ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিয়ম, নিষ্ক্রিয়তা এবং অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কমিশনকে সহযোগিতার তুলনায় অসহযোগিতাই বেশি করা হয়েছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, প্রধান দুই প্রতিপক্ষই কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে, যা পরোক্ষভাবে কমিশনের নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টারই একটি ইঙ্গিত হতে পারে।’
নির্বাচনি প্রচারণার ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হওয়ার দৃষ্টান্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে মনোনয়ন কেন্দ্রিক যে বিশাল ব্যয় হয়, নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতির কারণে যা এ গবেষণার আওতাভুক্ত করা সম্ভব হয়নি, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। দৃশ্যমান প্রচারণায় শীর্ষ দুই দল বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে লঙ্ঘনের মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ। সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশই এখন কোটিপতি বা শতকোটিপতি। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, তাদের অর্ধেকেরই বড় অংকের দায় বা ঋণ রয়েছে। সম্মিলিতভাবে সংসদ সদস্যদের ঋণের পরিমাণ অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। আমরা আশা করি, নতুন সংসদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকারগুলো প্রতিপালনে দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে। কারণ যারা নির্বাচিত হলেন তাদের প্রায় শতভাগই কোনো না কোনোভাবে কর্তৃত্ববাদ ও চোরতন্ত্রের কারণে ভুক্তভোগী।’
উল্লেখ্য, টিআইবি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় শুদ্ধাচার পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর ধারাবাহিক গবেষণা করছে। এই প্রেক্ষিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্র্যাকিং এবং নির্বাচনি হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতিভিত্তিক দুটি পৃথক ও পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্র্যাকিং-এর উদ্দেশ্যে মোট ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।