প্রকাশিত: মার্চ ২৮, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক। তিনি একজন সাহসী, সৎ ও দৃঢ়চেতা প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে সুপরিচিত। যেখানে তদবির ও প্রভাবের কারণে অনেকের অভিযান থেমে যেত, সেখান থেকেই তিনি দায়িত্ব পালনে আরও দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যেতেন। কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাবকে তিনি তোয়াক্কা করতেন না।
সততা, নির্ভীকতা ও পেশাদারিত্বের জন্য তিনি শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্ববাঙালির কাছেও সমাদৃত। একজন দায়িত্বশীল ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে তার কর্মজীবন বিশেষভাবে প্রশংসিত।
আজ তিনি তার ফেসবুক পোস্টে ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মামুন খালেদকে নিয়ে কিছু বক্তব্য দিয়েছেন।সেই বক্তব্য সিটি নিউজ ঢাকার পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
“ফেসবুকে আমি সরব নই। আজ এক সত্য প্রকাশ না করে পারলাম না। এ যেন বিবেকের দংশন! জেনারেল মামুন খালেদ ছিলেন এক সময়কার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সামরিক অফিসার। আমি ছিলাম পরিবেশ অধিদপ্তরের Director Enforcement। বহু রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী এবং প্রভাবশালীদের দখল থেকে উদ্ধার করছিলাম নদী, খাল, জলাশয়, পাহাড় ও বনভূমি। একদিকে মন্ত্রী ও প্রভাবশালীদের চাপ, আরেকদিকে কর্পোরেট শক্তিগুলোর হুমকি। ঢাকা বিমানবন্দরের অদূরে প্রায় ২৫০ একর প্রাকৃতিক জলাশয় ও নিরীহ মানুষের জমি, এমনকি কবরস্থান দখল করে গড়ে উঠছে আসিয়ান সিটির বিশাল আবাসন প্রকল্প—পুরোটাই অবৈধ। প্রশাসন, রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ—সবারই নীরবতা দেখে অসহায় মানুষের কান্না ও অভিশাপে আকাশ ভারী হয়ে আসছে। অজস্র অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল রাজউক, পুলিশ, প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে—কোনো প্রতিকার নেই। রাজউক চেয়ারম্যান আমাকে বললেন, “মুনীর চৌধুরী—আমি অসহায়।” অতঃপর সাহস করে অভিযানে নামলাম। অবৈধ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা জব্দ করে অকেজো করে দিলাম। প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলীকে গ্রেফতার করলাম। ততক্ষণে পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদের চাপ, অবশেষে ডিজিএফআই প্রধান মামুন খালেদের হুমকি, চাপ ও রক্তচক্ষু। ঘটনাস্থলে পাঠালেন তার কর্নেল স্টাফকে। অভিযান বন্ধের নির্দেশ এলো। আমি কর্নেল স্টাফকে ফিরিয়ে দিলাম। অভিযান অব্যাহত রেখে পুরো প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে আমার নিয়ন্ত্রণে আনলাম। ক্ষতিগ্রস্ত শত শত বাসিন্দাদের বললাম, “কোনো ভয় নেই, আমি পাশে আছি। অবৈধ আবাসন হবে না।” চাপ আরও ভয়ংকরভাবে এলো। মন্ত্রী বললেন, “জেনারেল মামুন টাকার বস্তাসহ আপনাকে গ্রেফতার করে মিডিয়ায় রিপোর্ট করবেন। আপনি অভিযান বন্ধ করেন। সেনাবাহিনী ক্ষেপে গেলে আওয়ামী সরকারের টিকে থাকা দায় হবে।” ক্ষোভ ঝেড়ে প্রত্যুত্তরে বললাম, “স্যার, আপনি সরকারের মন্ত্রী না? কেন ভয়?” সেই কর্নেল স্টাফের বারবার অনুরোধ—আসিয়ানের মালিকের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আমার জবাব—পরিবেশ সুরক্ষা এবং দেশের স্বার্থ সবার ঊর্ধ্বে। এরপর আসিয়ানের মালিককে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে তাকে চাপ দিয়ে সেই জরিমানা আদায় করলাম। এতে পরিবেশ মন্ত্রী এবং জেনারেল মামুন আরও ক্ষিপ্ত হলেন। আমার মন বলছে, কিসের জেনারেল মামুন খালেদ? কিসের ডিজিএফআই-এর হুমকি? সর্বময় ক্ষমতা আল্লাহর। ঐদিন রাতে আরও ভয়ংকর ঘটনা। আমি পরিবেশ ভবনে রাতযাপন করতাম; ঐ ভবন থেকে রাতে-দিনে সারা বাংলাদেশে অভিযানগুলো চালাতাম। আমার কোনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বলতে কিছুই ছিল না। যদিও “বেলা” কিংবা পরিবেশবাদী কোনো সংগঠন সেই পরিস্থিতিতে আমার পাশে দাঁড়ায়নি।
কোথায় আজ জেনারেল মামুন খালেদ???
সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা সীমা অতিক্রম করলে তা যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে দাঁড়ায়, এটি তার অনন্য নজির।
সরকারকে অনুরোধ জানাবো, সামরিক বাহিনীর আবাসন প্রকল্প জলসিঁড়ি বাস্তবায়নে জেনারেল মামুন খালেদের দুর্নীতির ঘটনা উদ্ঘাটন করুন। রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বস্তরে পেশাদারিত্ব, সততা ও যোগ্যতাকে সম্মান ও মূল্যায়ন করুন। নতুবা শাসনের সংকট থেকেই যাবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তরুণ প্রজন্মের অফিসারদের আহ্বান জানাবো—এসিআর অবমূল্যায়নের ভীতি, পদোন্নতি বঞ্চনার আতঙ্ক কিংবা শাস্তিমূলক বদলির আশঙ্কায় কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় নয়। পার্থিব এ পদ-পদবী ও অর্থবিত্ত—একসময় হয়ে যায় ভঙ্গুর ও শূন্য।”