• ঢাকা বৃহস্পতিবার
    ০৬ আগস্ট, ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

বাংলাদেশের মুরগির মাংসে উদ্বেগজনক অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি, কী বলছে আন্তর্জাতিক গবেষণা?

প্রকাশিত: আগস্ট ৬, ২০২৬, ০২:৪১ পিএম

বাংলাদেশের মুরগির মাংসে উদ্বেগজনক অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি, কী বলছে আন্তর্জাতিক গবেষণা?

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা

বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের বাজারে বিক্রি হওয়া পোলট্রি মুরগির মাংসে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় উদ্বেগজনক মাত্রায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল (অ্যান্টিবায়োটিক) ওষুধের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের Royal Veterinary College-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

কী পাওয়া গেছে গবেষণায়?

গবেষণার অংশ হিসেবে ২০২১-২২ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে ৫৫৮টি ব্রয়লার মুরগির বুকের মাংসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব নমুনার কিছু নেওয়া হয় খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে, আর কিছু নেওয়া হয় জবাইয়ের জন্য প্রস্তুত ফার্মের মুরগি থেকে।

নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করা হয় Nanyang Technological University-এর গবেষণাগারে। সেখানে ৬৯ ধরনের ভেটেরিনারি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পরীক্ষা করা হয় এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড।

ফলাফলে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নমুনায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের উপস্থিতি নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি। খুচরা বাজারের ৩.৭ থেকে ৮.৬ শতাংশ নমুনায় এই মাত্রা আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে।

এর বিপরীতে, ২০২১-২২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে একই ধরনের পরীক্ষায় নিরাপদ সীমা অতিক্রমের হার ছিল মাত্র ০.০৫ থেকে ০.০৯ শতাংশ।

কেন এত উদ্বেগ?

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রাণীর রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তবে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী, জবাইয়ের আগে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এসব ওষুধ বন্ধ রাখতে হয়। একে বলা হয় Withdrawal Period।

গবেষকদের ধারণা, দক্ষিণ এশিয়ার কিছু খামারে এই নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। ফলে জবাইয়ের সময়ও মুরগির শরীরে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থেকে যাচ্ছে, যা পরে মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে।

মানুষের জন্য কী ঝুঁকি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক-অবশিষ্টাংশযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)। অর্থাৎ ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ অনেক সংক্রমণের বিরুদ্ধে কম কার্যকর হয়ে যেতে পারে।

এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে অ্যালার্জি, অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের প্রতি সহনশীলতা তৈরির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?

বাংলাদেশে পোলট্রি শিল্প দেশের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস। এই খাতে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং বড় অর্থনৈতিক কার্যক্রম জড়িত। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য নয়, শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর নজরদারি, পশুচিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ প্রয়োগ বন্ধ করা, জবাইয়ের আগে বাধ্যতামূলক Withdrawal Period অনুসরণ এবং বাজারে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা বাড়ানো জরুরি।

গবেষকদের সুপারিশ

গবেষণার অন্যতম গবেষক অধ্যাপক পেলিগ্যান্ড বলেছেন, এই গবেষণা ভেটেরিনারি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অবশিষ্টাংশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।

গবেষণাটি ওয়ান হেলথ পোলট্রি হাব প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হয়েছে এবং এতে অর্থায়ন করেছে ইউকে রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন (UKRI) গ্লোবাল চ্যালেঞ্জেস রিসার্চ ফান্ড।

করণীয় কী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ গবেষণার ফলাফলকে আতঙ্কের কারণ হিসেবে নয়, বরং নীতিনির্ধারণ ও নজরদারি জোরদারের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। খামার পর্যায়ে দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক নজরদারি এবং খাদ্য নিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, পোলট্রি খাত, পশুচিকিৎসক, গবেষক এবং ভোক্তা—সবার সমন্বিত উদ্যোগই এখন সবচেয়ে জরুরি।

জাতীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ