প্রকাশিত: আগস্ট ২০, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম
গ্যাস সংকটে দিশেহারা মানুষ। গ্যাস নেই গাড়িতে ও বাড়িতে। শিল্পে উৎপাদন তলানিতে। দীর্ঘ প্রায় এক মাস ধরে চলা গ্যাস সংকটে রপ্তানি বাণিজ্য তথা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধস নামার উপক্রম হয়েছে। হঠাৎ পরিস্থিতির অবনতিতে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি গ্যাস সংকটের কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের ঘটনা এবং সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় এলএনজি কার্গো ক্রয় এবং সময়মতো সরবরাহ না দেওয়ার বিষয়টিতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার ব্যর্থতার দায় এসে পড়েছে জ্বালানি বিভাগের ওপর। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদকে এলএনজি ক্রয়সহ জ্বালানি বিভাগের কার্যক্রম নিয়মিত জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। উপদেষ্টা রেহান আসিফ বুধবার যুগান্তরকে বলেন, পুরো বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।
এদিকে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে ২১ জুলাই আগুন লাগার কারণ উদ্ঘাটনে সরকারি তদন্ত দলকে সহযোগিতা না করার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আগুন লাগার পর টার্মিনালটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় গ্যাস সরবরাহ করতে না পারায় সংকটের যাত্রা শুরু হয়। জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটিকে কোনো সহযোগিতাই করেনি এক্সিলারেট। কমিটির সদস্যরা মাতারবাড়ি পৌঁছার পরও তাদের টার্মিনালে উঠতে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীও ওই টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে ব্যর্থ হন। প্রতিমন্ত্রীকে সেখানে যাওয়ার অনুমতিই দেওয়া হয়নি। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এদিকে, পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী এলএনজি কার্গোর অভাবে বুধবার বেলা ৩টায় এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেছে। এখন শুধু সামিটের টার্মিনাল থেকে দিনে ৫৬ থেকে ৫৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগে ২১ জুলাই। আংশিকভাবে সেটি ৬ আগস্ট ঠিক হলেও এখনো সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। এজন্য জ্বালানি বিভাগের দায়িত্বে অবহেলা এবং অদূরদর্শিতাকে দায়ী করা হচ্ছে। অগ্নিদুর্ঘটনার পর থেকে এক্সিলারেটের জন্য এখনো এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করতে পারেনি জ্বালানি বিভাগ। ২৩ আগস্ট বিপি সিঙ্গাপুর থেকে একটি কার্গো আসার কথা। যদি আসে তখন গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হবে। তবে সামগ্রিকভাবে বিব্রত সরকার। গ্যাসের কারণে শত শত কারখানা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে পড়ছেন হাজারো শ্রমিক-কর্মচারী। এমন অবস্থায় পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নিজে তদারকির দায়িত্ব নিয়েছেন। তদন্তের মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারীদের শাস্তির আওতায় আনার উদ্যোগও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এক্সিলারেটের অসহযোগিতার অভিযোগ : এক্সিলারেটের টার্মিনালের বয়লারে আগুন লাগার পর সারা দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট শুরু হয়। বিষয়টি তদন্তে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব ফজলুল হকের নেতৃত্বে কমিটি করা হয়। কমিটি জুলাই মাসের শেষে মাতারবাড়ি যায়। সেখানে এক্সিলারেটের অগ্নিদুর্ঘটনা তদন্তের চেষ্টা করে কমিটি। কিন্তু এক্সিলারেট কমিটির সদস্যদের টার্মিনালে উঠতেই দেয়নি। কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেছেন-‘কমিটির সদস্যরা অনেকক্ষণ মাতারবাড়িতে অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু টার্মিনালে (ভাসমান জাহাজ) ৪০ জন কর্মরত আছেন। তাই নতুন করে কাউকে সেখানে উঠতে দেওয়া যাবে না বলে তারা জানিয়ে দেয়। এছাড়া সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীও ওই টার্মিনালে গিয়ে পরিদর্শন করতে চেয়েছিলেন। তাকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ওই প্রতিমন্ত্রীকে মাতারবাড়ির পরিবর্তে চট্টগ্রামের বোড ক্লাবে বৈঠক করতে বলা হয়েছে। পরে প্রতিমন্ত্রী না গিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে সেখানে পাঠান। এরপর সৌদি কোম্পানি আরামকোর মস টাইপ কার্গো থেকে এলএনজি খালাসে অপারগতা প্রকাশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ব্যাপারে বারবার চেষ্টা করেও এক্সিলারেট এনার্জির কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এক্সিলারেটের ওই টার্মিনালের জন্য দিনে পেট্রোবাংলা ২ লাখ ৩০ হাজার ডলারের বেশি ভাড়া দেয়।
সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় কেনা কার্গো আসেনি : সামিটের টার্মিনালের জন্য এক সপ্তাহ আগে সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় একটি কার্গো আসার কথা ছিল। কিন্তু সেটি আসেনি। কয়েকদিন পর সেখানে স্পট থেকে বিটল এশিয়া থেকে কিনে আগেভাগে সামিটের টার্মিনালে আনা হয় অন্য এক কার্গো। এই কারণেও কিছুদিন গ্যাসের সংকট হয়। অন্যদিকে, গত এক সপ্তাহ ধরে এক্সিলারেট টার্মিনাল পুরোদমে এলএনজি সরবরাহ করতে প্রস্তুত। কিন্তু সেখানে সংযুক্ত করার মতো কোনো কার্গো নেই। ২৩ আগস্ট বিপির একটি কার্গো আসলে এই টার্মিনাল চালু হবে। বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা থেকে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সিএনজি সরবরাহ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানি বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, সামগ্রিক বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে প্রধানমন্ত্রীকে। দিনে দু-একবার করে প্রধানমন্ত্রী বা তার টিমকে আপডেট জানাতে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, দীর্ঘায়িত গ্যাস সংকটের জন্য জ্বালানি বিভাগ অনেকটা দায়ী। সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় কেনা কার্গোগুলো আসবে না জেনে ৬ আগস্টের মন্ত্রিসভা কমিটিতে স্পট থেকে কেনা দুটি কার্গো ক্রয়ের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল ক্রয় কমিটিতে সেটি অনুমোদন করতে দেয়নি। যার খেসারত এখন দিচ্ছে পুরো দেশ। প্রায় ২৫ বছর পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান সরকার। ২০০১ সালের পর এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় এলএনজি কেনার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন জ্বালানি বিভাগকে। অবশ্য সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় ৭টি কোম্পানির ১৪টি কার্গো কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে বুধবারের অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে।
এদিকে এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় বুধবার বিকালে সারা দেশে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে। বুধবার সন্ধ্যায় সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ২২০ কোটি ঘনফুটের কম। বুধবার বিকাল ৫টায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট।