প্রকাশিত: আগস্ট ১৭, ২০২৬, ০৯:৩৪ এএম
উত্তর কোরিয়ার হুমকির মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া সীমিতের নির্দেশ ট্রাম্পের
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, কিম জং-উনের সঙ্গে তার ‘খুব ভালো সম্পর্কের’ ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠীর যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, উত্তর কোরিয়াকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে আনা হবে। এমন সিদ্ধান্তের সময় দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, কিম জং-উনের সরকার ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে নতুন যুদ্ধকৌশল রপ্ত করছে।
দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বছরে অনুষ্ঠিত দুটি বড় সামরিক মহড়ার একটি উলচি ফ্রিডম শিল্ড। এ বছরের মহড়া সোমবার শুরু হয়ে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।
মহড়ায় প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এবং জাতিসংঘ কমান্ডের (ইউএনসি) ১৮টি সদস্যদেশের মধ্যে ১১টি দেশের সেনা ও কর্মীদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। জাতিসংঘ কমান্ড হলো একটি বহুজাতিক সংস্থা, যা ১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধের সংঘাত বন্ধ করা যুদ্ধবিরতি চুক্তির তদারকি করে।
তবে রোববার সন্ধ্যায় ট্রাম্প বলেন, কিম জং-উনের সঙ্গে তার ‘খুব ভালো সম্পর্কের’ কারণে তিনি মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ নিয়ে ‘খুশি নন’। তিনি বলেন, এসব মহড়া ব্যয়বহুল এবং এমন একটি দেশের প্রতি ‘সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ও বৈরী সংকেত’ পাঠায়, যে দেশ তার প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ‘হুমকিহীন ও সম্মানজনক’ আচরণ করেছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, মহড়া বাতিল করার জন্য তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে মহড়ার পরিসর ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ার’ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেন, দক্ষিণ কোরিয়া ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের নিরস্ত্রীকরণে’ সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
শনিবার ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে কিম জং-উনের সঙ্গে তোলা একটি পুরোনো ছবিও প্রকাশ করেন। তিনি আবারও বলেন যে দুজনের ‘খুব ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে। এর ফলে ধারণা তৈরি হয়েছে, ট্রাম্প হয়তো কিমের সঙ্গে আবারও একটি শীর্ষ বৈঠকের উদ্যোগ নিতে পারেন।
এর আগেও কিমের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ট্রাম্প বড় ধরনের যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সামরিক মহড়া স্থগিত করেছিলেন। ২০১৮ সালে কিমের সঙ্গে তার প্রথম শীর্ষ বৈঠকের পর ওই বছরের উলচি ফ্রিডম গার্ডিয়ান মহড়া বাতিল করা হয়। অন্য কয়েকটি মহড়াও স্থগিত বা ছোট করা হয়েছিল। পরে মহড়াগুলো নতুন কাঠামো ও নামের অধীনে আবার চালু করা হয়।
গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা জানান, এবারের মহড়ায় ইউক্রেনে উত্তর কোরীয় সেনাদের অর্জিত ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন ড্রোন কৌশল।
২০২৪ সালের জুনে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করার পর দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকে সমর্থন করতে পিয়ংইয়ং সেনা, গোলাবারুদ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কমান্ডগুলোর জনসংযোগ পরিচালক কর্নেল রায়ান ডোনাল্ড বলেন, এবারের মহড়ার পরিস্থিতিতে ‘ড্রোন, জিপিএস ব্যবস্থা বিঘ্নিত করা এবং সাইবার হামলা’ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তিনি এসব হুমকির সঙ্গে ইউক্রেনে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করা উত্তর কোরীয় সেনাদের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প বলেন, উত্তর কোরীয় সেনারা ইউক্রেনে যে শিক্ষা অর্জন করেছে, তা দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। এর ফলে ‘উত্তর কোরিয়ার সক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রশিক্ষণে সেই হুমকিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ কারণেই এবারের মহড়া আগের মহড়াগুলোর চেয়ে আলাদা। গত পাঁচ বছর ধরে এটি ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে।’
জাতিসংঘ কমান্ডের উপ-কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্কট উইন্টার বলেন, মোকাবিলা করতে হবে এমন হুমকিগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং উত্তর কোরিয়ার ‘সমসাময়িক যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা’ প্রতিফলিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়া ইউক্রেন যুদ্ধকে তাদের কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পরীক্ষা করার সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করেছে। তার মতে, এবারের মহড়া হবে ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় ও উন্নত।’
ট্রাম্পের বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, যৌথ সামরিক মহড়া ‘আগে জানানো ও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ীই’ অনুষ্ঠিত হবে।
দ্য গার্ডিয়ান ট্রাম্পের মন্তব্য সম্পর্কে আরও বক্তব্যের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
১৪ হাজারেরও বেশি উত্তর কোরীয় সেনা রাশিয়ার বাহিনীর সঙ্গে ইউক্রেনের কুরস্ক অঞ্চলে যুদ্ধ করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া আরও ৩০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া তুমেন নদীর ওপর দুই দেশের মধ্যে নির্মিত প্রথম সড়ক সেতুর কাজও প্রায় শেষ করেছে। একটি ওপেন-সোর্স তদন্তে বলা হয়েছে, সেতুটি বাণিজ্যিক পথের চেয়ে সামরিক সরবরাহ ও লজিস্টিকসের করিডর হিসেবে বেশি কার্যকর হতে পারে।
রুশ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, সেতুটি সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার কথা।
মহড়া শুরুর কয়েক দিন আগে উত্তর কোরিয়া একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়। বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি কারণ ছিল যৌথ সামরিক মহড়ার প্রতিবাদ জানানো।
শুক্রবার উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মহড়াটিকে ‘আগ্রাসী যুদ্ধের মহড়া’ বলে অভিহিত করে এবং সতর্ক করে যে তারা ‘নতুন মাত্রার হুমকির জবাব নতুন মাত্রার প্রতিরোধক্ষমতা দিয়ে’ দেবে।
বড় ধরনের যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সামরিক মহড়ার আগে পিয়ংইয়ং সাধারণত এ ধরনের কঠোর ভাষায় হুমকি দিয়ে থাকে। অন্যদিকে দুই দেশই বারবার বলে এসেছে যে এসব মহড়ার প্রকৃতি প্রতিরক্ষামূলক।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষ বাহিনীর সাবেক কমান্ডার অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল চুন ইন-বুম ভবিষ্যতের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতার জন্য সময়মতো প্রস্তুতি নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার সক্ষমতার এটি অত্যন্ত গুরুতর উন্নতি। আর এই হুমকির পরিবেশকে আমাদের কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান