প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
দেশের ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে আজ বুধবার (১২ আগস্ট) সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তি হচ্ছে, সে জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে নতুন করে গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। অন্য একটি টার্মিনালও দুর্ঘটনার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। আর গ্যাসের সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলেছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনে।
একসঙ্গে দুই টার্মিনালে সমস্যা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকলে এসব কেন্দ্রকে আংশিক সক্ষমতায় চালাতে হয় কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়।
বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে বঙ্গোপসাগরের বৈরী আবহাওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। সাগর উত্তাল থাকায় এলএনজি বহনকারী জাহাজ থেকে গ্যাস খালাস ও সরবরাহের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে অপর একটি ভাসমান টার্মিনাল দুর্ঘটনার কারণে পুরো সক্ষমতায় চালু না থাকায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমেছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়াতে হয়েছে।
৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায় লোডশেডিং
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সংকটের কারণে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে পল্লী ও মফস্বল এলাকায়।
অনেক এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। বাসাবাড়ির পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র শিল্প, সেচ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সমস্যায় পড়েছে।
বিশেষ করে রাতের দিকে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন এলাকায় মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র ও উপকেন্দ্রে হামলা
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, উপকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ বিতরণ স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কারণ কোনো উপকেন্দ্র বা বিতরণকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু লোডশেডিং নয়, মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে হয়।
এ কারণে বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা চেয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো।
বিকল্পভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। গ্যাসের ঘাটতি যতটা সম্ভব অন্য উৎস থেকে পূরণ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি থাকলে তরল জ্বালানি বা অন্যান্য উৎস ব্যবহার করে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর সুযোগ থাকে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে দীর্ঘ সময় এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সরকারের জন্য ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাবও রয়েছে
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশে জ্বালানি সংকট আগে থেকেই ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলএনজি টার্মিনালের সমস্যা এবং বৈরী আবহাওয়া।
অর্থাৎ বর্তমান লোডশেডিংকে শুধু সাময়িক আবহাওয়াজনিত সমস্যা হিসেবে দেখছে না সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের সরবরাহ ঘাটতি, গ্যাসের সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে চাহিদার ভারসাম্যহীনতাকেও এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সন্ধ্যা থেকে স্বস্তির আশা
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এলএনজি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হলে আজ বুধবার সন্ধ্যা থেকেই লোডশেডিং কমতে পারে।
তবে এটি পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসার নিশ্চয়তা নয়। গ্যাস সরবরাহ কত দ্রুত বাড়ানো যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল কতটা সক্ষমতায় ফিরতে পারে—তার ওপর পরিস্থিতির বড় অংশ নির্ভর করছে।
ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ
চলমান বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তি হচ্ছে, সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে এবং দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে গ্রাহকদের প্রত্যাশা, শুধু সাময়িকভাবে লোডশেডিং কমানো নয়; বরং গ্যাস সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বঙ্গোপসাগরের বৈরী আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়া, এলএনজি টার্মিনালগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে আসা এবং গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।