• ঢাকা বুধবার
    ১২ আগস্ট, ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

পরমাণু কর্মসূচি নয়, হরমুজই এখন ইরানের প্রধান চাপের হাতিয়ার: মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন

প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম

পরমাণু কর্মসূচি নয়, হরমুজই এখন ইরানের প্রধান চাপের হাতিয়ার: মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

পারমাণবিক কর্মসূচির পরিবর্তে এখন হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ প্রয়োগের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে ইরান—এমনই মূল্যায়ন করেছে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ।

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সামরিক হামলার পর তেহরানের কৌশলগত অগ্রাধিকার আরও পরিবর্তিত হয়েছে। এখন পারমাণবিক সক্ষমতার চেয়ে হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বিস্তার করাকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ তৈরির বেশি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করছে ইরান।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।

হরমুজ খুলতে সামরিক অভিযান নিয়ে ট্রাম্পকে সতর্কতা

এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালি দখল করা কিংবা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পুনরায় সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার চেষ্টা সহজ কোনো অভিযান হবে না।

তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ ধরনের সামরিক অভিযান দীর্ঘমেয়াদি, ব্যয়বহুল এবং প্রাণঘাতী হতে পারে। এমনকি বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহারের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করা সম্ভব নাও হতে পারে।

কারণ, হরমুজ প্রণালির আশপাশের ভৌগোলিক পরিবেশ ইরানকে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থান দেয়। সরু জলপথের দুই পাশে ইরানের উপকূলীয় অঞ্চল থাকায় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরি করা সম্ভব।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজও হামলার ঝুঁকিতে

এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ইউরোপীয় ও উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালি সামরিক শক্তি দিয়ে খুলতে গেলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং অন্যান্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

তিন ইউরোপীয় কর্মকর্তা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই আরব কর্মকর্তা একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি জোর করে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে যায়, তাহলে সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। এতে শুধু মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামো ও বন্দরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে গোয়েন্দা মূল্যায়নের মতপার্থক্য

তবে মার্কিন প্রশাসন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ওয়াশিংটনের অনুমতি ছাড়া ইরানে কোনো পণ্য প্রবেশ করতে পারবে না।

তবে একই সঙ্গে একজন মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং এটি আইনগতভাবে কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।

ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেছেন, প্রয়োজন হলে জাহাজ চলাচলের জন্য সাময়িক বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে এবং এ জন্য কোনো অনুমোদন, পারমিশন, টোল বা অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হবে না।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?

হরমুজ প্রণালি ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী একটি সরু সমুদ্রপথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বিশ্বের তেলবাণিজ্যের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি এই পথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে যায়। একইভাবে কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর এলএনজি রপ্তানির ক্ষেত্রেও এই জলপথের গুরুত্ব অনেক।

এ কারণে হরমুজে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লেই অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

তেলের দাম ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উত্তেজনা দেখা দিলে এর প্রভাব দ্রুত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ছড়িয়ে পড়বে।

তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপও নতুন করে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের সংকট হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

ইরানের কৌশলে কী পরিবর্তন?

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি সামুদ্রিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগের সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর যদি দেশটির পারমাণবিক অবকাঠামো সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য অন্য কৌশল বেছে নিতে পারে।

হরমুজ প্রণালি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে সীমিত সামরিক তৎপরতাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।

সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

হরমুজকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, তেল স্থাপনা, বন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামোও সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়বে। জাহাজ মালিক ও বীমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি বিবেচনায় পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সামনে বড় পরীক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের

সব মিলিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও প্রশাসনের বক্তব্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যেখানে হরমুজকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি দেখছেন, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার মতো সক্ষমতা রাখে।

তবে বাস্তবে হরমুজ প্রণালিকে সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘ সময় নিরাপদ রাখা কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কারণ, এটি শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়—বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ধমনি। ফলে হরমুজকে ঘিরে যেকোনো বড় সামরিক সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে তেল, গ্যাস, পরিবহন, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ