• ঢাকা বুধবার
    ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা

বাংলাদেশের আকাশে নতুন প্রতিযোগিতা

প্রকাশিত: জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৪:২০ পিএম

বাংলাদেশের আকাশে নতুন প্রতিযোগিতা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত এক দশকে আন্তর্জাতিক বিমান ভ্রমণের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। প্রবাসী শ্রমিক, শিক্ষার্থী, চিকিৎসাপ্রার্থী, পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহনও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু এই দ্রুত সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশীয় বিমান সংস্থাগুলো নয়; বরং বিদেশি এয়ারলাইনস।

খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাত্রী পরিবহনের বাজারের আকার বছরে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। অথচ এই বিশাল বাজারের বড় অংশই বিদেশি এয়ারলাইনসের নিয়ন্ত্রণে। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়েই দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস।

সম্প্রতি বোয়িং থেকে ২১টি নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ লিজে আনার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের এই উদ্যোগ শুধু বহর বাড়ানোর পরিকল্পনা নয়; বরং বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্পে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনে বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সম্মিলিত বাজার অংশীদারি ৩০ শতাংশেরও কম। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারের অন্তত অর্ধেক নিজস্ব এয়ারলাইনস নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশও সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারে, যদি বহর, অবকাঠামো ও নীতিগত সহায়তা একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া যায়।

শুধু নতুন বিমান নয়, নতুন বাজারের লড়াই

নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার পর ইউএস-বাংলার পরিকল্পনা শুধু বিদ্যমান রুটে ফ্লাইট বাড়ানো নয়, বরং নতুন বাজারে প্রবেশ করা। দক্ষিণ এশিয়ার কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, কাঠমান্ডু ও কলম্বোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্রুনেই, জোহর বাহরু ও পেনাংয়ে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার কুনমিং, শেনজেন, বেইজিং, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারেও প্রবেশের প্রস্তুতি চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, মদিনা, দাম্মাম ও সালালাহও রয়েছে সম্প্রসারণ তালিকায়।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দিকে নজর

ইউএস-বাংলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অন্যতম অংশ হলো ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ সংগ্রহ করে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় সরাসরি ফ্লাইট চালু করা। বর্তমানে এসব রুটে বাংলাদেশি যাত্রীদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্য, ভারত বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন হাব ব্যবহার করে ভ্রমণ করেন। সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে ভ্রমণের সময় কমবে, যাত্রীদের ব্যয় কমবে এবং দেশের এয়ারলাইনসগুলোর আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

চট্টগ্রাম ও সিলেটকে আন্তর্জাতিক গেটওয়েতে রূপান্তরের পরিকল্পনা

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যাত্রীদের বড় একটি অংশ চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের হওয়ায় এই দুই শহরকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায় ইউএস-বাংলা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানেই বোয়িং উড়োজাহাজ স্থায়ীভাবে রাখা হবে এবং আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধাও গড়ে তোলা হবে। এর ফলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

কেন পিছিয়ে দেশীয় এয়ারলাইনস?

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে ল্যান্ডিং চার্জ, পার্কিং ফি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যয় এবং বিভিন্ন কর ও চার্জ প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় বেশি। এছাড়া একটি রানওয়ের ওপর দীর্ঘদিন নির্ভরশীল থাকা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতাও দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে প্রভাবিত করেছে।

দক্ষ জনবল গঠনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

বহর বাড়ানোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নেও বড় বিনিয়োগ করছে ইউএস-বাংলা। শত শত পাইলট ও এয়ারক্রাফট প্রকৌশলী তৈরির উদ্যোগের পাশাপাশি পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক মানের একটি এভিয়েশন ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে বিদেশে প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং দেশে দক্ষ জনবল তৈরি হবে।

কার্গো ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও উচ্চমূল্যের পণ্যের রপ্তানি বাড়ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক এয়ার কার্গোর বড় অংশ এখনো বিদেশি অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণে। এই বাজারেও প্রবেশ করতে চায় ইউএস-বাংলা। ভবিষ্যতে পৃথক কার্গো এয়ারলাইনস চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।

পর্যটন ও এভিয়েশনকে একসঙ্গে দেখার আহ্বান

বিশ্বের সফল এভিয়েশন হাবগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, শক্তিশালী বিমান যোগাযোগ ছাড়া পর্যটনশিল্পের বিকাশ সম্ভব নয়। একইভাবে পর্যটনের প্রসারও বিমান পরিবহনের চাহিদা বাড়ায়। তাই কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সহজ ভিসা ব্যবস্থা, আধুনিক বিমানবন্দর এবং উন্নত ট্রানজিট সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

দক্ষিণ এশিয়ার এভিয়েশন হাব হওয়ার সুযোগ

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে। আধুনিক অবকাঠামো, প্রতিযোগিতামূলক নীতিমালা, নতুন বিমানবন্দর, সহজ ট্রানজিট ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী দেশীয় এয়ারলাইনস গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন হাবে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর বহর সম্প্রসারণ, নতুন আন্তর্জাতিক রুট, দক্ষ জনবল, কার্গো ব্যবসা এবং পর্যটনের সমন্বিত উন্নয়ন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্প এখন একটি নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে নীতিগত সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং দ্রুত বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এভিয়েশন ও পর্যটন সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ