• ঢাকা শুক্রবার
    ১২ জুন, ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সম্পাদকীয়: বিশ্বকাপ ২০২৬—ফুটবলের বিস্তার, নাকি বাণিজ্যের নতুন অধ্যায়?

প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ১০:৪৯ পিএম

সম্পাদকীয়: বিশ্বকাপ ২০২৬—ফুটবলের বিস্তার, নাকি বাণিজ্যের নতুন অধ্যায়?

সম্পাদকীয়

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ও আবেগঘন আয়োজনগুলোর একটি। আর ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সেই অর্থে এক যুগান্তকারী ঘটনা। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—যৌথভাবে আয়োজন করছে এই মহাযজ্ঞ। একই সঙ্গে ৩২ দলের পরিবর্তে ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে, আর ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১০৪টিতে।  

ফিফার যুক্তি স্পষ্ট—বিশ্বকাপকে আরও বৈশ্বিক করা। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার আধিপত্যের বাইরে এশিয়া, আফ্রিকা এবং কনকাকাফ অঞ্চলের দেশগুলো আরও বেশি সুযোগ দাবি করে আসছিল। নতুন ফরম্যাটে সেই সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক নতুন দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ফুটবলের গণতন্ত্রীকরণের একটি ইতিবাচক দিক।  

তবে প্রশ্নও কম নয়। বিশ্বকাপ কি অতিরিক্ত সম্প্রসারণের ফলে তার ঐতিহ্যগত প্রতিযোগিতামূলক মান হারাবে? ১০৪ ম্যাচের দীর্ঘ টুর্নামেন্টে কি দর্শকদের আগ্রহ একইভাবে ধরে রাখা সম্ভব হবে? নাকি এটি মূলত সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং বাণিজ্যিক আয়ের নতুন হিসাব? ফিফার জন্য এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক বিশ্বকাপগুলোর একটি।  

নতুন ফরম্যাটে ১২টি গ্রুপ থেকে সেরা তৃতীয় স্থানধারী দলও নকআউট পর্বে উঠবে। ফলে একটি দল গ্রুপে তৃতীয় হয়েও শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ পাবে। এতে নাটকীয়তা যেমন বাড়বে, তেমনি গ্রুপপর্বের গুরুত্ব নিয়ে বিতর্কও তৈরি হতে পারে।  

এই বিশ্বকাপ আরেকটি কারণে বিশেষ। এটি সম্ভবত এক যুগের অবসান এবং আরেক যুগের সূচনার প্রতীক। লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে এটি। অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিন ইয়ামাল কিংবা আরও অনেক তরুণ তারকার জন্য এটি হতে পারে বিশ্ব ফুটবলের নতুন নেতৃত্ব গ্রহণের মঞ্চ।  

ফুটবল সবসময়ই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ১৯৩০ সালের ছোট্ট টুর্নামেন্ট থেকে আজকের বৈশ্বিক মহোৎসবে পরিণত হওয়ার পথও সহজ ছিল না। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই পরিবর্তনের আরেকটি বড় ধাপ। এর সফলতা নির্ভর করবে শুধু দর্শকসংখ্যা বা আয়ের ওপর নয়; বরং নতুন দেশগুলোর অংশগ্রহণ, প্রতিযোগিতার মান এবং ফুটবলের সার্বজনীন আবেদন কতটা শক্তিশালী হয়, তার ওপর।

বিশ্বকাপ ২০২৬ তাই কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি ফুটবলের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, তারও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ইতিহাস বলবে, ফিফার এই সাহসী সিদ্ধান্ত ফুটবলকে আরও সমৃদ্ধ করেছে, নাকি কেবল বাণিজ্যের পরিধি বাড়িয়েছে।

আর্কাইভ