• ঢাকা মঙ্গলবার
    ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

রাষ্ট্রপতির বিদায়, জিতুক সংবিধান

প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১০:৪১ পিএম

রাষ্ট্রপতির বিদায়, জিতুক সংবিধান

সম্পাদকীয়

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি। নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও এই পদ রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, সংবিধানের মর্যাদা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। তাই রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের গুঞ্জন কেবল একজন ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পরিপক্বতারও পরীক্ষা।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে কয়েকদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গন সরব। এরই মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরছেন। ঘটনাক্রম স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে—রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া কি শুরু হতে যাচ্ছে?

যদিও সরকার কিংবা বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবুও সংবিধানের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রপতি চাইলে তাঁর পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে জমা দিয়েই দায়িত্ব ছাড়তে পারেন। আর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকারই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থাৎ, ব্যক্তি নয়—সংবিধানই রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে।

এখানেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র পরিচালিত হয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। তাই রাষ্ট্রপতির বিদায় যদি হয়ও, সেটি যেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জয়-পরাজয়ের প্রতীক না হয়ে সংবিধানের বিজয়ের প্রতীক হয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাংবিধানিক পদগুলো প্রায়ই দলীয় বিতর্কের অংশ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতির পদও তার ব্যতিক্রম নয়। অথচ রাষ্ট্রপতি এমন একটি পদ, যা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষার কথা বলে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের আলোচনা যত সহজে সামনে আসে, ততটাই প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক চাপের বাইরে রাখার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এমন এক সময় দায়িত্ব পালন করেছেন, যখন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। ক্ষমতার পালাবদল, অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ, নতুন সংসদ—সবকিছুর মধ্যেই তিনি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর দায়িত্বকাল নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, সমালোচনা থাকতে পারে; কিন্তু কোনো সাংবিধানিক পদধারীর বিদায়ও যেন সংবিধানের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেই হয়—এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা।

যদি সত্যিই রাষ্ট্রপতির বিদায়ের সময় এসে থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ এবং সংবিধানসম্মত। কারণ রাষ্ট্রপতির পরিবর্তনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং জনগণের আস্থা অটুট রাখা।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন রাজনৈতিক সংযম, দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইনের শাসনের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা। ব্যক্তি আসবেন, ব্যক্তি চলে যাবেন; কিন্তু সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই টিকে থাকবে। সেই সত্যটিই যেন আবারও প্রতিষ্ঠিত হয়।

আর্কাইভ