• ঢাকা শনিবার
    ১৩ জুন, ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
চাপে তেল আবিব

বৈরুত হামলার জবাবে ইরানের বার্তা, শক্তি হারায়নি তেহরান

প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

বৈরুত হামলার জবাবে ইরানের বার্তা, শক্তি হারায়নি তেহরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইসরায়েলি (জায়নবাদী) শাসনের বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে হামলার জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে কেবল একটি সাময়িক সামরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট একটি কৌশলগত বার্তা, যা তেল আবিব, ওয়াশিংটন এবং সমগ্র পশ্চিম এশিয়ার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক চল্লিশ দিনের যুদ্ধের পর যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহল ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল, তখন তেহরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দেখিয়ে দিয়েছে যে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এখনও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে একটি নির্ধারক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

এই হামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল—সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানের প্রতিক্রিয়া জানানোর ইচ্ছাশক্তি ও সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারেনি। যুদ্ধ শুরু করার ক্ষেত্রে তেল আবিবের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এই ধারণা সৃষ্টি করা যে দীর্ঘ সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের পর ইরান আর সরাসরি ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবে না। কিন্তু অধিকৃত ভূখণ্ডের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে ইরান দেখিয়েছে যে তার ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো এখনও সক্রিয়, সক্ষম এবং অভিযানের জন্য প্রস্তুত।

বাস্তবে, তেহরানের এই প্রতিক্রিয়া ইসরায়েলের কৌশলগত হিসাব-নিকাশের একটি স্পষ্ট ব্যর্থতা। তেল আবিব আশা করেছিল সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানের সামরিক শক্তিকে ক্ষয় করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দেখিয়েছে যে ইরান শুধু তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাই ধরে রাখেনি, বরং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কৌশলগত পর্যায়ে অভিযান পরিচালনার সামর্থ্যও বজায় রেখেছে।

এই হামলার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (Axis of Resistance)-এর প্রতি। বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলের হামলা মূলত লেবাননের হিজবুল্লাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্রের ওপর আঘাত ছিল। ইরানের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে যে তেহরান এখনও লেবাননের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং হিজবুল্লাহর অবস্থানকে তার প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে পশ্চিমা ও ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রচারণা সত্ত্বেও ইরান ও হিজবুল্লাহর কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অর্জন হতে পারে একটি নতুন প্রতিরোধ সমীকরণের সৃষ্টি। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল লেবানন, সিরিয়া, ইরাক এমনকি ইরানের ওপরও সরাসরি মূল্য না দিয়ে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু তেহরানের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া এই বার্তা দিয়েছে যে বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে আগ্রাসনের জবাবে অধিকৃত ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা হতে পারে। অন্য কথায়, কিছু ইসরায়েলি বিশ্লেষকের ভাষায়, “বৈরুতের বিনিময়ে হাইফা” এখন একটি নতুন নিরাপত্তা সমীকরণে পরিণত হচ্ছে।

এ ধরনের সমীকরণ ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করতে পারে। এখন থেকে লেবাননের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ শুধু উত্তর সীমান্তের সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং তা ইরানের সঙ্গে বৃহত্তর সংঘর্ষের দিকে গড়াতে পারে। ফলে তেল আবিবের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরাপত্তা ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে এবং এটি ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতিকে নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াশিংটন সামরিক চাপ ও হুমকিকে কূটনৈতিক আলোচনায় অধিক সুবিধা আদায়ের একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। ইরানের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে যে তেহরান এখনও তার কঠোর শক্তি (Hard Power) কূটনৈতিক সমীকরণে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম। অর্থাৎ, সামরিক চাপ ইরানকে পিছু হটাতে পারবে না; বরং তা আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ব্যয় আরও বাড়াতে পারে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা। আধুনিক সংঘাতে শক্তির অন্যতম সূচক হলো যুদ্ধের পর দ্রুত সামরিক সক্ষমতা পুনর্নির্মাণের সামর্থ্য। সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে যে ইরান এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে এবং যুদ্ধের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তার ক্ষেপণাস্ত্র ও কমান্ড সক্ষমতা কার্যকরভাবে বজায় রাখতে পেরেছে। এটি ইরানের প্রতিপক্ষদের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা, কারণ বৃহৎ আকারের সংঘাত হলেও ইরানের প্রতিরোধক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করা সহজ নয়। মেহের নিউজের কলাম 
 

আর্কাইভ