• ঢাকা বুধবার
    ১২ আগস্ট, ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

ঝু রোংজি কে ছিলেন?

প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম

ঝু রোংজি কে ছিলেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান স্থপতি, কঠোর সংস্কারক এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজি আর নেই। বুধবার (১২ আগস্ট) বেইজিংয়ে অসুস্থতাজনিত কারণে ৯৭ বছর বয়সে মারা গেছেন তিনি। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া তাঁর মৃত্যুর খবর জানিয়েছে।

ঝু রোংজি শুধু চীনের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক নেতা, যাঁর নেতৃত্বে ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে চীনের অর্থনীতি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, ব্যাংকিং ও করব্যবস্থার পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং চীনকে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রধান কারিগর ঝু রোংজি মারা গেছেন

প্রকৌশলী থেকে চীনের শীর্ষ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক

১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর হুনান প্রদেশের চাংশায় জন্মগ্রহণ করেন ঝু রোংজি। তিনি বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করেন। প্রকৌশল শিক্ষার পর তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে।

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা উত্থান-পতনে ভরা। রাজনৈতিকভাবে কঠিন সময় পার করে পরে তিনি ধীরে ধীরে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে উঠে আসেন। ১৯৮৮ সালে সাংহাইয়ের মেয়র হওয়ার পর তাঁর দক্ষতা জাতীয় পর্যায়ে বিশেষভাবে নজরে আসে।

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজি মারা গেছেন

সাংহাইয়ের মেয়র থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু

সাংহাইয়ের মেয়র হিসেবে ঝু রোংজি শহরটির আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সাংহাইকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

সাংহাইয়ে তাঁর কাজের সাফল্যের পর ১৯৯১ সালে তাঁকে চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী করা হয়। পরে ১৯৯৩ সালে তিনি পিপলস ব্যাংক অব চায়নার গভর্নরের দায়িত্ব নেন। এই সময় তিনি মূল্যস্ফীতি, অতিরিক্ত ঋণ এবং অর্থনীতির অতিরিক্ত উত্তাপ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেন।

৯৭ বছর বয়সে মারা গেলেন চীনের আধুনিক অর্থনীতির রূপকার ঝু রোংজি -  DesheBideshe

১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী

১৯৯৮ সালে ঝু রোংজি চীনের প্রধানমন্ত্রী হন। তখন দেশটির অর্থনীতি দ্রুত বাড়লেও সামনে ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ—লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের সীমিত সংযুক্তি।

ঝু এসব সমস্যা মোকাবিলায় একের পর এক কঠিন সংস্কার শুরু করেন। তাঁর নীতি ছিল পরিষ্কার—চীনের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও বাজারমুখী হতে হবে।

‘কঠিন সংস্কারক’ হিসেবে পরিচিতি

ঝু রোংজির সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার। বছরের পর বছর লোকসানে চলা অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ, একীভূত বা পুনর্গঠন করা হয়।

এর ফলে বিপুলসংখ্যক কর্মী চাকরি হারান। সামাজিকভাবে এর বড় প্রভাব পড়লেও ঝু মনে করতেন, অদক্ষ ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখলে চীনের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে আরও দুর্বল হবে।

এই কঠোর অবস্থানের কারণেই তিনি চীনের রাজনীতিতে ‘আয়রন ম্যান’ ধরনের ভাবমূর্তি তৈরি করেন।

চীনকে বিশ্ব অর্থনীতির দরজায় নিয়ে যাওয়া

ঝু রোংজির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অর্জনগুলোর একটি ছিল চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) যোগদানের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া।

দীর্ঘ আলোচনার পর ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর চীন আনুষ্ঠানিকভাবে WTO-এর সদস্য হয়। এর ফলে চীনের পণ্য ও শিল্প বিশ্ববাজারে আরও ব্যাপকভাবে প্রবেশের সুযোগ পায় এবং বিদেশি বিনিয়োগও বাড়তে থাকে।

পরবর্তী দুই দশকে চীন যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন ও রপ্তানি শক্তিতে পরিণত হয়, সেই রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই সময়েই।

সরাসরি কথা বলতেন, ভয় পেতেন না সমালোচনাকে

ঝু রোংজি ছিলেন স্পষ্টভাষী নেতা। দুর্নীতি, সরকারি কর্মকর্তাদের অদক্ষতা, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও প্রশাসনিক অপচয়ের বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্যেই কঠোর বক্তব্য দিতেন।

চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সাধারণত নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্য অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হলেও ঝুর বক্তব্যে অনেক সময় ব্যক্তিগত দৃঢ়তা ও সরাসরিতা দেখা যেত। এ কারণে তিনি চীনের সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

সাফল্যের সঙ্গে ছিল বিতর্কও

তাঁর সংস্কারগুলো যেমন চীনের অর্থনীতিকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সাহায্য করে, তেমনি এর সামাজিক মূল্যও ছিল বড়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কারণে ব্যাপক ছাঁটাই, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং আয়বৈষম্য নিয়ে সমালোচনা হয়। ফলে ঝু রোংজির অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে চীনে এখনও নানা ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে।

তবে তাঁর সমর্থকদের মতে, এসব কঠিন সিদ্ধান্ত না নিলে চীনের অর্থনীতিকে দ্রুত বিশ্ববাজারের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হতো না।

কেন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঝু রোংজি?

ঝু রোংজি এমন একটি সময় চীনের অর্থনীতির নেতৃত্ব দেন, যখন দেশটি পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে বাজারমুখী অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, করব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং WTO-তে যোগদানের মতো পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তিনি চীনের অর্থনীতির কাঠামোতেই বড় পরিবর্তন আনেন।

তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব শেষ হয় ২০০৩ সালে। কিন্তু তাঁর সময় নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত পরবর্তী বছরগুলোতে চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

এই কারণেই ঝু রোংজিকে শুধু চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, আধুনিক চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে স্মরণ করা হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ