প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০৯:৪৮ এএম
সাইকেল মেরামতের দোকানে বাবার নিত্যসঙ্গী দেব মণ্ডলের দিন কেটে যেত টুংটাং শব্দে। এলাকায় দারুণ ফুটবল খেলার সুনাম থাকলেও বরিশালের উজিরপুরের এই কিশোরের বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছিল না।
অবশেষে গত মে মাসে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস খুলে দেয় সেই দুয়ার। নিজের প্রতিভা জানান দেওয়ার মঞ্চে আলো-ঝলমলে পারফরম্যান্সে সরকারি উজিরপুর বারো বাইকা মডেল ইনস্টিটিউশনের নবম শ্রেণির এই ছাত্র জায়গা করে নেয় সেরা প্রতিভাদের তালিকায়।
সেই তালিকায় দেব একা নয়, নানা খেলার আরো অনেক প্রতিভাবান খুদে ক্রীড়াবিদও তার সঙ্গী। এই যেমন শেরপুরের রাকিব মিয়া।
নিজের শহরে একটি সুইমিংপুলও নেই, অথচ বাংলাদেশের হয়ে অলিম্পিকে সাঁতরানোর স্বপ্ন রাজমিস্ত্রি বাবার দারিদ্র্যপীড়িত সংসারের এই প্রতিনিধির। ৫০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোক ও বাটারফ্লাইতে সোনাজয়ী অষ্টম শ্রেণির এই ছাত্র নিজেকে তুলে ধরার মঞ্চ পেয়ে জ্বলে ওঠে। দেশজুড়ে তার মতো এ রকম প্রতিভাবানরা গতকাল এসে মিশেছিল এক মোহনায়। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের প্রথম আসর থেকে বাছাই করা প্রতিভাবানদের পুরস্কৃত করার আয়োজনের মধ্যমণি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই।
তিনি নতুন প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘তোমরা নিজেকে কখনো ছোট ভাববে না, নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। তুমি যত শক্তভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে, তুমি তোমার বাংলাদেশকে তত সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারবে।’
‘স্বপ্নের পথে, বিজয়ের সাথে’—এই স্লোগান নিয়ে চলতি বছরের ২ মে শুরু হয় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ প্রতিযোগিতা। আসরের প্রতিপাদ্য ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকরাও ছিলেন মঞ্চেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমরা যদি আগামী দিনে নিজেদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারো, তাহলে আমরাও ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই যে গ্যালারিতে হাজার হাজার ছোট বন্ধুরা, তোমরা বসে আছ, তোমাদের মধ্য থেকেই এই দেশের একজন ভালো ডাক্তার বের হবে, তোমাদের ভেতর থেকে এই দেশের একজন ভালো আর্কিটেক্ট বের হবে, তোমাদের ভেতর থেকে এই দেশের একজন ভালো ইঞ্জিনিয়ার বের হবে, তোমাদের ভেতর থেকে এই দেশে একজন ভালো ক্রিকেটার বের হবে, ভালো সাঁতারু বের হবে, ভালো টেনিস খেলোয়াড় বের হবে। অর্থাৎ তোমাদের মধ্য থেকে খেলোয়াড়ও বের হয়ে আসবে।’
বাছাই করা প্রতিভাবানদের নিয়ে আয়োজন যাতে মূল শিরোনামে জায়গা পায়, গণমাধ্যমের প্রতি সেই অুনরোধও রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘মিডিয়ার ভাই আপনারা যাঁরা এখানে উপস্থিত আছেন, সেটা ইলেকট্রনিক মিডিয়া হোক বা প্রিন্ট মিডিয়া, আপনাদের কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে। আপনাদের মাধ্যমে আপনাদের কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ এডিটর সাহেবদের কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে। এই যে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস হয়ে গেল, আজকে ফাইনাল খেলা হলো—আমরা সব সময় দেখি যে পত্রিকায় বা নিউজে বিভিন্ন বিষয় হাইলাইট করা হয় বা লিড নিউজ করা হয়ে থাকে। আজকে যে ইভেন্টটা আপনারা দেখে গেলেন, এরাই হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। যারা প্যান্ডেলের নিচে বসে আছে, যারা গ্যালারিতে বসে আছে—তারা হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে, বাচ্চাদের খেলার খবরটি যেন আগামীকাল (মঙ্গলবার) লিড করা হয়। এটি আমার অনুরোধ রইল আপনাদের কাছে। আশা করি, কালকের (পত্রিকায়) বা রাতে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে আমাদের এই ভবিষ্যেক আপনারা তুলে ধরবেন।’
বাংলাদেশে নানা সমস্যার কথা স্বীকার করে তিনি আরো বলেছেন, ‘অস্বীকার করছি না যে বাংলাদেশে অনেক সমস্যা আছে। কিন্তু এর মধ্যেও আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বাংলাদেশকে আমরা কোথায় নিয়ে যেতে পারব? আমরা জানি অনেক স্কুলে হয়তো ঠিকমতো ফ্যান চলে না। তোমাদের স্কুলগুলো আমরা ধীরে ধীরে গড়ে তোলার কাজ করছি।’ দেশ গড়ার কাজে বাছাই করা প্রতিভাবান এই ক্রীড়াবিদদের ভূমিকা রাখার বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা এই দেশকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার কাজ করছি। এই কাজটি আমরা তখনই করতে পারব, যখন তোমরা যারা গ্যালারিতে বসে আছ, আমার হাতের বাঁ পাশে তোমরা যারা খেলোয়াড়রা বসে আছ, যারা পুরস্কার পেয়েছ, তোমরা যদি নিজেদের গড়ে তুলতে পারো, তাহলে আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারব।’
‘বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে কে কে কাজ করবে?’—গ্যালারিতে বসে থাকা কিশোর-কিশোরীদের এই প্রশ্নও ছুড়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি জবাবও জানতে চান, ‘আমার সঙ্গে আছ তোমরা? কারা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাও, হাত তোলো।’ এই সময় পুরো গ্যালারির হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী একসঙ্গে হাত উঁচু করলে প্রধানমন্ত্রী তাদের ধন্যবাদ জানান। পড়ার সময় মনোযোগ দিয়ে পড়ার পাশাপাশি খেলার সময় সেটিতেও পুরো মনোনিবেশ করার আহবান জানান তিনি। এখন থেকে চোখের সামনে কাউকে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলতে দেখলে যেন এই কিশোর-কিশোরীরা বারণ করে কিংবা নিজেরা যেন সেই ময়লা তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে—নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের বাছাই করা প্রতিভাবানদের কাছে সে বিষয়েও সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি গাছ লাগিয়ে, পরিবেশ বাঁচিয়ে বুকভরা শ্বাস নেওয়ার কাজেও পুরস্কৃতদের উদ্যোগ নিতে বলেছেন তারেক রহমান। পশু-পাখির প্রতি নির্দয় না হয়ে তাদের যত্ন নেওয়ার অনুরোধও তিনি রেখেছেন এইসব কিশোর-কিশোরীর কাছে। এ বিষয়ে তাদের কাছে প্রতিশ্রুতি চাইলে সবাই সমস্বরে হ্যাঁ-সূচক জবাবও দিয়েছে। তাদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা আছি তোমাদের সঙ্গে। তোমরা পড়ালেখা করতে চাইলে সরকার থেকে আমরা এর ব্যবস্থা করব। তোমরা যে গান গাইতে চাইবে, যে ছবি আঁকতে চাইবে, যে খেলাধুলা করতে চাইবে—তোমাদের সব রকম সহযোগিতা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে সরকার।’ বিজয়ীদের অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তারেক রহমান। বিজয়ীদের জন্য ঘরের মাঠের এই সাফল্যই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ট্রফি জেতার ভিত হবে বলে আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। পুরস্কার প্রদানের আগে মাঠে বসে খেলাও দেখেছেন তিনি। বালকদের ফুটবলে ময়মনসিংহ অঞ্চলকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সিলেট। বালিকাদের বিভাগে রাজশাহীকে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রংপুরের মেয়েরা। বিকেল ৪টায় শুরু হওয়া এই খেলাটি প্রধানমন্ত্রী গ্যালারিতে বসে নয়, দেখেছেন একদম মাঠের পাশে বসে। বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট, মেডেল ও চেক তুলে দেন তারেক রহমান। নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের প্রথম আসরে আটটি ডিসিপ্লিনে অংশ নেয় প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার খুদে ক্রীড়াবিদ। সেখান থেকে বাছাই করা ৩১০ জনকে নিয়ে বিকেএসপিতে হবে দুই মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ শিবির। সেখানে বাছাই হওয়া প্রতিভাবানরা সরকারি খরচে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে।